বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) চলমান সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে ক্রিকেটারদের প্রকাশ্য বয়কটের মধ্য দিয়ে। বিসিবি পরিচালক ও অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান এম নাজমুল ইসলামের বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে শুরু হওয়া এই বিরোধ এখন সরাসরি মাঠের ক্রিকেটে প্রভাব ফেলছে।
বিতর্কিত মন্তব্য থেকেই আগুন
বিসিবির অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান ও পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের একটি মন্তব্য থেকেই সাম্প্রতিক এই সংকটের সূত্রপাত। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত বিসিবির দোয়া ও মিলাদ মাহফিল শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জাতীয় দলের পারফরম্যান্স ও ক্রিকেটারদের পেছনে ব্যয়ের বিষয়টি টেনে আনেন।
টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ব্যর্থতা প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্যকে ক্রিকেটাররা অবমাননাকর ও অসম্মানজনক বলে মনে করেন।
ক্রিকেটারদের আলটিমেটাম:
এই মন্তব্যের পরপরই ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব জরুরি বৈঠক ডাকে। এরপর জুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন স্পষ্ট ভাষায় আলটিমেটাম দেন—নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এম নাজমুল ইসলাম পদত্যাগ না করলে সব ধরনের ক্রিকেট বন্ধ থাকবে।
মিঠুন জানান, ক্রিকেটারদের সম্মান ও পেশাদারিত্ব প্রশ্নের মুখে পড়লে মাঠে নামার আর কোনো নৈতিক দায় থাকে না।
পাঁচ দফা দাবি
আজ বনানীতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কোয়াব পাঁচটি নির্দিষ্ট দাবির কথা জানায়। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেটের সংকট সমাধান, নারী ক্রিকেটারদের যৌন হয়রানির অভিযোগ নিষ্পত্তি, এম নাজমুল ইসলামের পদত্যাগ, বিপিএল থেকে বাদ পড়া নয় ক্রিকেটারের বিষয়ে বিসিবির ব্যাখ্যা এবং ক্রিকেটারদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করা।
ক্রিকেটাররা জানান, বিকেলের মধ্যে বোর্ডের পক্ষ থেকে লিখিত প্রতিশ্রুতি পেলে সন্ধ্যার ম্যাচে মাঠে নামতে তারা প্রস্তুত।
বিপিএলের ম্যাচ বয়কট
আলটিমেটামের সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও নাজমুল পদত্যাগ না করায় দুপুর ১টায় নির্ধারিত বিপিএলের ম্যাচে মাঠে নামেননি ক্রিকেটাররা।
এরপর সন্ধ্যা ছয়টার ম্যাচটিও অনুষ্ঠিত হয়নি। মাঠে ম্যাচ অফিসিয়াল ও ধারাভাষ্যকারদের দেখা গেলেও কোনো দলের খেলোয়াড় মাঠে আসেননি। পিচ ঢেকে দেওয়া হয়, সীমানাদড়ি সরিয়ে নেওয়া হয়।
বিসিবির ব্যাখ্যা ও অবস্থান
পরিস্থিতির মধ্যে বিসিবি জানায়, এম নাজমুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত জবাব চাওয়া হয়েছে। বোর্ড দাবি করে, বিষয়টি তারা গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং নিয়ম মেনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
চাপ বাড়তে থাকায় বিকেলে বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, এম নাজমুল ইসলামকে অর্থ কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে।
পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। বোর্ড জানায়, গঠনতন্ত্রের ৩১ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে সংস্থার কার্যক্রম নির্বিঘ্ন থাকে।
বিপিএল স্থগিতের হুঁশিয়ারি
ক্রিকেটারদের দাবির মুখে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামকে ফাইন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। বরং মাঠে ক্রিকেটাররা না ফিরলে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে বোর্ড।
বিসিবির এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আজকের মধ্যে ক্রিকেটাররা মাঠে না ফিরলে টুর্নামেন্ট চালিয়ে নেওয়ার বাস্তব সুযোগ থাকবে না। সে ক্ষেত্রে বিপিএল স্থগিত ঘোষণা করা ছাড়া বিকল্প দেখছে না বোর্ড।
তবুও সংকট
অর্থ কমিটি থেকে সরানো হলেও ক্রিকেটাররা স্পষ্ট করেছেন, নাজমুল যদি পরিচালক পদে বহাল থাকেন, তাহলে মাঠে ফেরার প্রশ্নই আসে না।
বিকেলের সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় দলের তিন সংস্করণের অধিনায়ক উপস্থিত থাকায় ক্রিকেটারদের ঐক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে বিসিবি ও ক্রিকেটারদের সম্পর্ক এখন চরম টানাপোড়েনে। দ্রুত সমাধান না এলে বিপিএল স্থগিত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ ঠিক করে দিতে পারে।

