প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতেই যেন জানুয়ারি ট্রান্সফার উইন্ডোকে পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছে ম্যানচেস্টার সিটি। একের পর এক সিদ্ধান্তে পরিষ্কার—এবার কেবল দৌড়ে থাকা নয়, শীর্ষে ফেরার বার্তাটাই দিতে চাইছে পেপ গার্দিওলার দল।
বর্নমাউথ থেকে গত সপ্তাহে আনা আনতোয়ান সেমেনিও মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রভাব দেখাতে শুরু করেছেন। প্রথম দুই ম্যাচেই দুটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছেন ঘানার এই ফরোয়ার্ড। সিটির আক্রমণভাগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে তার উপস্থিতি।
এরই মধ্যে আরও বড় একটি ডিলের পথে হাঁটছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। ক্রিস্টাল প্যালেস অধিনায়ক মার্ক গুহির সঙ্গে নীতিগতভাবে চুক্তিতে পৌঁছেছে সিটি। সবকিছু চূড়ান্ত হলে রক্ষণভাগে বড় শক্তি যোগ হবে বলেই আশা করছেন গার্দিওলা।
চোট সমস্যা আর ছয় পয়েন্টের ব্যবধান
সেন্ট্রাল ডিফেন্সে চোট সমস্যায় ভুগছে সিটি। রুবেন দিয়াস ও ইয়োশকো গভার্দিওলের ইনজুরি পরিস্থিতিকে সামনে রেখেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে ক্লাবকে। অন্যদিকে, টানা তিন ম্যাচ ড্রয়ের পর আর্সেনালের সঙ্গে ছয় পয়েন্টের ব্যবধান কমানোও বড় চ্যালেঞ্জ।
গত এক বছরে যে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, জানুয়ারির এই দুই সম্ভাব্য সংযোজন সেটাকেই পূর্ণতা দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে গুহির চুক্তি এখনো আনুষ্ঠানিক হয়নি। লিভারপুল গ্রীষ্মে চেষ্টা করেও তাকে দলে ভেড়াতে পারেনি—সে অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই সতর্ক সিটি। তবু সব লক্ষণ বলছে, এবার শেষটা ইতিবাচক দিকেই যাচ্ছে।
আর্থিক সক্ষমতায় সিটির এগিয়ে থাকা
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪১৪ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে ১৪ জন খেলোয়াড় দলে নিয়েছে সিটি। স্কোয়াডে এসেছে বড় পরিবর্তন। গত মৌসুমে টানা আট বছর পর কোনো বড় ট্রফি জিততে না পারার হতাশার পরই এই নতুন অধ্যায় শুরু।
কেভিন ডি ব্রুইনে, এদেরসন, ইলকাই গুনদোয়ান, কাইল ওয়াকার ও জ্যাক গ্রিলিশ—সাম্প্রতিক সাফল্যের এই মূল স্তম্ভদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে কমেছে দলের গড় বয়স ও বেতন কাঠামো।
২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরের হিসাবে সিটির মোট আয় ছিল ৬৯৪ মিলিয়ন পাউন্ড—ক্লাবের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ।
ফুটবল অর্থনীতিবিদ কিরান ম্যাগুয়ার বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, “পিএসআর বিবেচনায় ম্যানচেস্টার সিটি অবিশ্বাস্য রকম শক্ত অবস্থানে আছে। গত তিন বছরে তাদের লাভ ১৪৪ মিলিয়ন পাউন্ড। যেখানে ক্লাবগুলো সর্বোচ্চ ১০৫ মিলিয়ন লোকসানের অনুমতি পায়, সেখানে সিটির হাতে অনেক জায়গা আছে।”
তিনি আরও বলেন, “যেটা অনেকের চোখ এড়িয়েছে, তা হলো খেলোয়াড় বিক্রিতে সিটির দক্ষতা। তিন বছরে তারা বিক্রি করে ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড লাভ করেছে। কোল পালমারকে চেলসির কাছে ৪০ মিলিয়নে বিক্রি পুরোপুরি লাভ—কারণ সে একাডেমির খেলোয়াড় ছিল।”
কেন গুহি গুরুত্বপূর্ণ
গুহি যোগ দিলে ইতিহাদে বাড়তি তৃপ্তিই থাকবে। ইউরোপের একাধিক ক্লাবই তাকে চেয়েছিল। ২৫ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডারকে সিটি দীর্ঘদিন ধরেই নজরে রেখেছিল।
রুবেন দিয়াস ও গভার্দিওলের চোটে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হলেও, এটি কোনো হুটহাট কেনা নয়—ক্লাব সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই চুক্তি।
গত মৌসুম থেকে প্রিমিয়ার লিগের সেন্টার-ব্যাকদের মধ্যে ক্লিনশিট, ডুয়েল জয়, অ্যারিয়াল ডুয়েলসে সাফল্য ও লাইন-ব্রেকিং পাস—সব ক্ষেত্রেই গুহি আছেন শীর্ষ দশে। ইংল্যান্ডের ইউরো ২০২৪ ফাইনাল যাত্রা এবং গত মৌসুমে ওয়েম্বলিতে সিটির বিপক্ষে প্যালেসকে এফএ কাপ জেতানো—সব মিলিয়ে বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতাও আছে তার।
চুক্তির শেষ দিকে থাকা একজন আন্তর্জাতিক মানের ডিফেন্ডারকে ২০ মিলিয়ন পাউন্ডে পাওয়া সিটির জন্য লাভজনক হিসেবেই ধরা হচ্ছে।
আর্সেনালের দিকেও তাকিয়ে সবাই
এই শক্তি প্রদর্শন আর্সেনালের চোখ এড়াচ্ছে না। গুহিকে তারা গ্রীষ্মে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু সিটি দ্রুত এগিয়ে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ।
মাইকেল আর্তেতার অধীনে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ৯০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি খরচ করেছে আর্সেনাল। শুধু গত গ্রীষ্মেই ২৫০ মিলিয়ন।
তবু আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কা দেখছেন না ম্যাগুয়ার, “এই মাসে যদি আর্সেনালকে ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করতে হয়, তারা সেটা পারবে। পিএসআর নিয়ে তাদের চিন্তার কিছু নেই।”
ম্যানচেস্টার সিটি তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই—এই বার্তার জবাব আর্সেনাল কীভাবে দেয়?

