বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সময় এখন ক্যালেন্ডারে মাপা যাচ্ছে না। দিন আর রাতের সীমারেখা যেন মুছে গেছে। কখনো ভোররাতে, কখনো গভীর রাতে—ভিন্ন ভিন্ন টাইম জোনে থাকা ক্রিকেট বোর্ডগুলোর শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে টানা যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। উদ্দেশ্য একটাই—টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অবস্থানকে আন্তর্জাতিক সমর্থনের জায়গায় নিয়ে যাওয়া।
আইসিসিতে দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে বিশ্বের প্রায় সব পূর্ণ সদস্য দেশের বোর্ডের সঙ্গে ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্ক রয়েছে বুলবুলের। বিসিবির সভাপতি হওয়ার পর সেই নেটওয়ার্কই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতের বাইরে, বিশেষ করে শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের ম্যাচ আয়োজনের দাবিতে সমর্থন জোগাড় করতেই এই নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।
প্রশ্ন হলো—এই প্রচেষ্টা কি শেষ পর্যন্ত ফল দেবে?
আইসিসির সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে আজ-কালের মধ্যেই কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে—এমন আভাস মিললেও নির্দিষ্ট ডেডলাইনের কথা স্বীকার করছে না বিসিবি। তবে পরিস্থিতি যে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেটি পরিষ্কার।
বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই বিসিবি ভারতের মাটিতে দল পাঠাতে অনিচ্ছুক। নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখিয়ে ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি জানানো হলেও আইসিসির পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত মিলেছে। বিশ্বকাপের আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা—এই কাঠামো বদলাতে নারাজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গতকাল আবারও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। সচিবালয়ে তিনি বলেন, “উদাহরণ আছে—পাকিস্তানে ভারত খেলতে যাবে না বললে আইসিসি ভেন্যু বদলেছে। আমরা অত্যন্ত যৌক্তিক কারণেই ভেন্যু পরিবর্তনের কথা বলছি। অযৌক্তিক চাপ দিয়ে আমাদের ভারতে খেলতে বাধ্য করা যাবে না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আইসিসি যদি কারও চাপের কাছে নতি স্বীকার করে আমাদের ওপর অযৌক্তিক শর্ত চাপিয়ে দেয়, আমরা সেটা মানব না।”
এই অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের মধ্যেও। দল নির্বাচন, প্রস্তুতি—সবকিছুই যেন ঝুলে আছে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। বিষয়টি প্রকাশ্যেই উঠে এসেছে টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাসের কণ্ঠে।
গতকাল তিনি বলেন, “যে ১৫ জন বিশ্বকাপে যাবে, তারা এখনো জানে না কোন দেশে যাবে বা কাদের বিপক্ষে খেলবে। আমি যেমন অনিশ্চয়তায় আছি, সবাই তেমনই আছে।”
একটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের ঠিক আগে এমন মানসিক অবস্থান যে প্রস্তুতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
আইসিসির ভেতরের বাস্তবতা ও বাংলাদেশের শঙ্কা
বিসিবির একটি দায়িত্বশীল সূত্রের দেওয়া তথ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। আইসিসির দুবাই সদর দপ্তরে কর্মরত ৭৬ জনের মধ্যে ৫৮ জনই ভারতীয় নাগরিক। চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ভারতীয়দের আধিপত্য রয়েছে। কমার্শিয়াল, মিডিয়া, ইভেন্টস, ব্রডকাস্ট ও স্ট্র্যাটেজির মতো বিভাগেও নেতৃত্বে ভারতীয় কর্মকর্তারা।
এই বাস্তবতায় ভারতের অবস্থানের বাইরে গিয়ে আইসিসির সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা সম্ভব—সে প্রশ্ন উঠছেই। বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার আশঙ্কা তাই একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আইনি পথের কথাও ভাবছে বিসিবি
এই আশঙ্কা বাস্তব হলে বিসিবি প্রস্তুত রাখছে বিকল্প পথও। আইসিসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের বিপক্ষে গেলে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালত—সিএএসে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আছে বলে জানা গেছে।
এটি যে সহজ সিদ্ধান্ত নয়, সেটিও বোর্ড জানে। তবে বিসিবির এক পরিচালক বিষয়টি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করে বলেছেন,
‘প্রতিকূল পরিবেশে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের চেয়ে আমরা আমাদের দেশকে বেশি ভালোবাসি।’
এই একটি বাক্যেই যেন বর্তমান সংকটের সারকথা লুকিয়ে আছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—আইসিসি শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটে? বাংলাদেশকে ছাড়াই বিশ্বকাপ আয়োজন, নাকি ভেন্যু পুনর্বিবেচনা? উত্তরের অপেক্ষায় শুধু বিসিবি নয়, পুরো দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা।

