জোসে মরিনহোর দীর্ঘ এবং নাটকীয় ক্যারিয়ারে রোমাঞ্চকর মুহূর্তের অভাব নেই। কিন্তু বুধবার রাতে লিসবনে যা ঘটল, তা সম্ভবত তাঁর ফুটবলীয় স্ক্রিপ্টকেও হার মানাবে। চ্যাম্পিয়নস লিগের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ১৫ বারের চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদকে হারানোই বেনফিকার জন্য যথেষ্ট ছিল না, তাদের প্রয়োজন ছিল আরও বড় কিছুর। আর সেই অসাধ্য সাধন করলেন দলের গোলরক্ষক আনাতোলি ট্রুবিন।
লিসবনের এস্তাদিও দা লুজ স্টেডিয়ামে তখন ইনজুরি টাইমেরও শেষ মুহূর্ত। রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ৩-২ গোলে এগিয়ে ছিল বেনফিকা। কিন্তু টুর্নামেন্টের নতুন ফরম্যাট অনুযায়ী, গোল ব্যবধানে টিকে থাকতে হলে তাদের আরও একটি গোলের প্রয়োজন ছিল। অন্যথায় চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বিদায় ঘণ্টা বেজে যেত মরিনহোর শিষ্যদের। এমন সময় পাওয়া একটি ফ্রি-কিকই ছিল শেষ ভরসা।
গোলরক্ষক যখন গোলদাতা
ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে গোলরক্ষক ট্রুবিনকে ডি-বক্সে যাওয়ার নির্দেশ দেন মরিনহো। মুহূর্তের মধ্যেই ইতিহাস রচিত হয়। বুলেট গতির এক হেডারে বল জালে পাঠিয়ে স্টেডিয়ামে উন্মাদনা ছড়িয়ে দেন ২৪ বছর বয়সী এই ইউক্রেনীয় গোলরক্ষক। গোলের পর ট্রুবিনের সেই বুনো উদযাপন আর ‘নি স্লাইড’ দীর্ঘকাল ভক্তদের মনে গেঁথে থাকবে।
ম্যাচ শেষে উচ্ছ্বসিত মরিনহো বলেন, “এটি একটি ফ্যান্টাস্টিক গোল, একটি ঐতিহাসিক গোল। এই গোলটি পুরো স্টেডিয়ামকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। রিয়াল মাদ্রিদকে হারানো বেনফিকার জন্য অনেক বড় সম্মানের বিষয়। আমাদের জয়টা প্রাপ্য ছিল।”
ট্রুবিনের বিস্ময় ও মার্সেইয়ের বিদায়
নতুন ফরম্যাটের জটিল সমীকরণ সম্পর্কে মাঠের ভেতর পুরোপুরি অবগত ছিলেন না ট্রুবিন। গোলের কয়েক মিনিট আগেও সময় নষ্ট করার জন্য তিনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলেন।
ট্রুবিন পরে বলেন, “আমি জানতাম না আমাদের আরও গোল লাগবে। হঠাৎ দেখলাম সবাই আমাকে ইশারায় সামনে যেতে বলছে। আমি কেবল গেলাম এবং গোল করলাম। আমি কখনোই গোল করতে অভ্যস্ত নই, ২৪ বছর বয়সে এটিই আমার ক্যারিয়ারের প্রথম গোল।”
ট্রুবিনের এই গোলটির কারণে কপাল পুড়ল অলিম্পিক মার্সেইয়ের। ফরাসি ক্লাবটি প্লে-অফ রেস থেকে ছিটকে গেল আর নাটকীয়ভাবে সেই জায়গা দখল করে নিল বেনফিকা। অথচ মরিনহোর জন্য গত কয়েক মাস খুব একটা সহজ ছিল না। লিগে তৃতীয় স্থানে থাকা এবং ঘরোয়া কাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর মরিনহোর সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। তবে নিজের সাবেক ক্লাব রিয়ালের বিপক্ষে এই জয় তাঁর সব সমালোচনাকে আড়াল করে দিয়েছে।
মরিনহোর ওপর ভরসা ও আরবেলোয়া ফ্যাক্টর
বেনফিকার এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের নায়ক হিসেবে মরিনহোর কৌশলের প্রশংসা করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা। রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে ছিলেন আলভারো আরবেলোয়া, যাকে মরিনহো নিজের ‘পুত্রের’ মতো মনে করেন। নিজের ছাত্র ও সাবেক ক্লাবের বিপক্ষে এই জয় মরিনহোর ক্যারিয়ারে বিশেষ স্থান করে নেবে।
এমনকি ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলাও এই ঘটনার পর অবাক হয়েছেন। তিনি মজা করে বলেন, “আমি জানতাম না বেনফিকার আরও গোল লাগবে। যখন গোলরক্ষক উপরে গেল, আমরা ভাবছিলাম ও কেন যাচ্ছে! কারণ মাদ্রিদ পাল্টা আক্রমণ করলে তারা বিপদে পড়তে পারত। কিন্তু জোসের স্ট্র্যাটেজি দারুণ ছিল!”
সামনে কি ইন্টার না কি আবারও রিয়াল?
লিগ পর্বের শেষে বেনফিকা ২৪তম স্থানে এবং রিয়াল মাদ্রিদ ৯ম স্থানে থাকায় প্লে-অফে আবারও এই দুই দলের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। এছাড়া মরিনহোর আরেক সাবেক ক্লাব ইন্টার মিলানের বিপক্ষেও খেলার সম্ভাবনা রয়েছে বেনফিকার। মরিনহো অবশ্য কোনো ক্লাবকেই আলাদা করে বেছে নিতে চান না।
তিনি বলেন, “মাদ্রিদ বা মিলান—যেখানেই খেলা পড়ুক, আমি খুশি। তবে ট্রুবিনের ওই মিরাকল গোলটিকে ছাপিয়ে যাওয়া খুব কঠিন হবে।”

