আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ করে আইসিসি

ক্রিকেট মাঠে যখন চার-ছক্কার বৃষ্টি হয়, গ্যালারিতে তখন চলে গগনবিদারি চিৎকার। কিন্তু মাঠের বাইরে ড্রেসিংরুম কিংবা গ্যালারির চেয়েও বড় এক লড়াই চলে আইসিসির সদর দপ্তরে—সেটি হলো অর্থের লড়াই। সম্প্রতি ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে হাজার কোটি টাকার অংক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইসিসি এই টাকা পায় কোথায়? আর সেই আয়ের ভাগই বা কীভাবে দেশগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হয়? ক্রিকেটের এই জটিল অর্থব্যবস্থার নেপথ্য কাহিনি নিয়েই আমাদের আজকের বিশেষ প্রতিবেদন।

আয়ের মেশিন: আইসিসি যেভাবে তহবিল গড়ে

আইসিসি সরাসরি কোনো টিকিট বিক্রি বা স্টেডিয়ামের ভাড়ার ওপর নির্ভর করে না। তাদের আয়ের তিনটি প্রধান স্তম্ভ রয়েছে:

১. সম্প্রচার ও ডিজিটাল স্বত্ব (The Goldmine): আইসিসির মোট আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে টিভি ও ডিজিটাল প্রচারের অধিকার বিক্রি থেকে। বর্তমান ২০২৪-২০২৭ চক্রে এই স্বত্বের মূল্য আকাশছোঁয়া—প্রায় ৩.২ বিলিয়ন ডলার (৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি)। ভারতের বিশাল দর্শক বাজারের কারণে ডিজনি স্টারের মতো জায়ান্টরা এই স্বত্ব কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।

২. গ্লোবাল স্পনসরশিপ: এমিরেটস, কোকা-কোলা কিংবা ইনডাসইন্ড ব্যাংকের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো আইসিসির ইভেন্টে বিজ্ঞাপনের জন্য কোটি কোটি ডলার দেয়। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের ১০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনের দাম ২৫-৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

৩. আয়োজক ফি ও লাইসেন্সিং: টুর্নামেন্ট আয়োজন করার জন্য আয়োজক দেশ আইসিসিকে ফি প্রদান করে। এছাড়া মার্চেন্ডাইজ ও গেম ডেটা বিক্রি থেকেও বড় অংকের আয় হয়।

আয়ের বণ্টন: কে কত বড় টুকরো পায়?

আইসিসি তার নিট আয়ের (বছরে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার) টাকা বোর্ডগুলোর মধ্যে ভাগ করার জন্য একটি বিশেষ ‘গাণিতিক মডেল’ ব্যবহার করে।

এখানে চারটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে অর্থ বণ্টন হয়: ক্রিকেটের ইতিহাস, গত ১৬ বছরের মাঠের পারফরম্যান্স, পূর্ণ সদস্যপদের মর্যাদা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বাণিজ্যিক অবদান।

বিসিসিআই (ভারত): বিশ্ব ক্রিকেটের আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে ভারতের বাজার থেকে। তাই আইসিসির মোট আয়ের ৩৮.৫% একাই পায় ভারত, যার বার্ষিক অংক প্রায় ২৩০ মিলিয়ন ডলার।

বিসিবি (বাংলাদেশ): বাংলাদেশ এই মডেল থেকে পায় প্রায় ৪.৪৬%। অর্থাৎ আইসিসি থেকে বিসিবির বার্ষিক আয় প্রায় ২৬.৭৪ মিলিয়ন ডলার (২৮০-২৯০ কোটি টাকা)।

অন্যান্য: ইংল্যান্ড পায় ৬.৮৯%, অস্ট্রেলিয়া ৬.২৫% এবং পাকিস্তান ৫.৭৫%। বাকি পূর্ণ সদস্য ও সহযোগী দেশগুলো আয়ের ১১.২% ভাগ করে নেয়।

একটি ম্যাচ বাতিলের চড়া মাশুল

ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই তো ৬ হাজার কোটি টাকার বাজার! আইসিসির পুরো বাণিজ্যিক মডেলটি মূলত এই একটি ম্যাচের হাইপের ওপর দাঁড়িয়ে। যদি পাকিস্তান ম্যাচটি বয়কট করে, তবে সম্প্রচারকারীরা আইসিসির কাছে বিশাল অঙ্কের রিফান্ড বা ক্ষতিপূরণ দাবি করবে। এর ফলে আইসিসির লভ্যাংশ কমে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা বা আয়ারল্যান্ডের মতো বোর্ডগুলোর ওপর, যারা আইসিসির অর্থের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।

সহজ কথায়, আইসিসি হলো এমন এক প্রতিষ্ঠান যা মূলত ভারতের বিশাল বাজার থেকে টাকা তুলে তা বিশ্ব ক্রিকেটে ছড়িয়ে দেয়। এই চেইনটি ভেঙে গেলে সবচেয়ে বড় বিপদে পড়বে ছোট ও মাঝারি ক্রিকেট বোর্ডগুলো।