ফুটবল ইতিহাসের সেই চিরস্মরণীয় মুহূর্তগুলোর কথা ভাবুন তো—ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অফ গড’, ২০১০ বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের বাতিল হওয়া গোল কিংবা মেক্সিকোর বিপক্ষে কার্লোস তেভেজের অফসাইড গোল। যদি সেই সময় আজকের উন্নত প্রযুক্তি থাকত, তবে ফুটবলের ইতিহাস হয়তো আজ অন্যভাবে লেখা হতো। ইতিহাসের সেই ভুলগুলোকে পেছনে ফেলে এবং নিখুঁত বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জন্য অ্যাডিডাস নিয়ে এসেছে তাদের নতুন বিস্ময়—‘ট্রিওন্ডা’ (Trionda)।
তিনটি দেশ, ১৬টি শহর ও এক চ্যালেঞ্জ
২০২৬ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর ১৬টি ভিন্ন ভিন্ন শহরে। প্রতিটি শহরের আবহাওয়া, উচ্চতা এবং বায়ুমণ্ডল একে অপরের থেকে আলাদা। ভ্যাঙ্কুভারের স্নিগ্ধ পরিবেশ থেকে শুরু করে মেক্সিকো সিটির অধিক উচ্চতা—সবখানেই বলের গতি ও আচরণ এক রাখা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
অ্যাডিডাসের ফুটবল ইনোভেশন প্রধান হ্যানেস শ্যাফকে জানিয়েছেন, এই বৈচিত্র্যময় পরিবেশের কথা মাথায় রেখেই ‘ট্রিওন্ডা’র ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। উচ্চতা ও তাপমাত্রার কারণে বলের ভেতরে বাতাসের চাপের যে পরিবর্তন হয়, তা মোকাবিলা করতে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলোকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই বল।
‘ট্রিওন্ডা’ নামের সার্থকতা ও নকশা
‘ট্রিওন্ডা’ শব্দটি এসেছে ‘Tri’ (তিন) এবং ‘Onda’ (ঢেউ) থেকে। তিনটি আয়োজক রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং ফুটবলের গতিশীলতাকে ফুটিয়ে তুলতে এই নামকরণ। বলের রঙের নকশায় ফুটে উঠেছে আয়োজক তিন দেশের পতাকার ছাপ, আর সোনালি রং মনে করিয়ে দেয় বিশ্বকাপের সেই আরাধ্য ট্রফিকে। বলের গায়ে থাকা বিশেষ টেক্সচার এবং গ্রাফিক্স গোলরক্ষক ও স্ট্রাইকারদের গ্রিপ উন্নত করতে সাহায্য করবে।
বিস্ময়কর প্রযুক্তি: বলের ভেতরেই রয়েছে ‘মস্তিষ্ক’
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের পর ‘ট্রিওন্ডা’ হলো দ্বিতীয় বল যেটিতে ‘কানেক্টেড টেকনোলজি’ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এবার চিপের অবস্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। বলের ভারসাম্য ঠিক রাখতে চিপটিকে ব্লাডারের পাশে স্থাপন করা হয়েছে এবং কাউন্টার-ওয়েট ব্যবহার করে এর নিখুঁত ঘূর্ণন নিশ্চিত করা হয়েছে।
অ্যাডিডাস এটি নিশ্চিত করতে ‘ব্লাইন্ড টেস্ট’ বা অন্ধ পরীক্ষা চালিয়েছে, যেখানে ফুটবলাররা বুঝতেও পারেননি যে বলের ভেতর চিপ আছে কি না।
অ্যাডিডাস কর্মকর্তা হ্যানেস শ্যাফকে বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল প্রযুক্তিটি এমনভাবে রাখা যাতে খেলোয়াড়রা এর অস্তিত্ব টেরই না পায়।”
রোবট টেস্ট ও নিখুঁত নির্ভুলতা
এই ফুটবলটি তৈরির প্রক্রিয়ায় অ্যাডিডাস তাদের নিজস্ব ‘কিকিং রোবট’ ব্যবহার করেছে। প্রায় ১০০টি বলের ওপর শত শতবার শট নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে এর ফ্লাইং পাথ বা বাতাসের গতিপথ কতটা সঠিক। ফিফার যে মানদণ্ড রয়েছে, অ্যাডিডাস তার চেয়েও অনেক বেশি কড়া নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এই বলটি তৈরি করেছে।
ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’ কি এখন সম্ভব?
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, ‘ট্রিওন্ডা’র সেন্সর প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার সিগন্যাল পাঠাতে সক্ষম। ফলে বল হাতে লাগল না মাথায়, তা মুহূর্তের মধ্যেই ভিএআর (VAR) রুমে ধরা পড়বে।
২০২২ বিশ্বকাপে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর একটি হেডার গোল নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল, যা এই চিপের মাধ্যমেই সমাধান করা হয়েছিল। হ্যানেস শ্যাফকে আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান, যদি আজ ম্যারাডোনার সেই হ্যান্ড অফ গড হতো, তবে এই বল ‘অন দ্য স্পট’ তা ধরে ফেলত। এমনকি অফসাইড নির্ণয়েও এই বল রেফারিকে দ্রুততম সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
প্যানেল রহস্য ও আধুনিক ফুটবল
পুরানো ফুটবলগুলোতে অনেকগুলো প্যানেল থাকলেও ‘ট্রিওন্ডা’ তৈরি করা হয়েছে মাত্র ৪টি প্যানেল দিয়ে। প্যানেলের মাঝখানের খাঁজগুলো (Grooves) বলকে বাতাসে স্থির রাখতে সাহায্য করে। অ্যাডিডাস ইউনিভার্সিটি পার্টনারদের সহায়তায় রকেটের গতিবিদ্যা বিশ্লেষণ করে এই বলের অ্যারোডাইনামিকস ঠিক করেছে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে যখন বলটি মাঠে গড়াবে, তখন খেলোয়াড়রা হয়তো কেবল এর গতি আর নির্ভুলতা অনুভব করবেন। কিন্তু এর ভেতরে থাকা কয়েক বছরের গবেষণা আর প্রযুক্তি নিশ্চিত করবে যে, মাঠের কোনো ভুলই যেন আর অলক্ষ্যে না থাকে।
আগামী গ্রীষ্মে মাঠ কাঁপাতে প্রস্তুত ‘ট্রিওন্ডা’—যা কেবল একটি ফুটবল নয়, বরং আধুনিক বিজ্ঞানের এক অনন্য নিদর্শন।

