অ্যানফিল্ডে টানা দ্বিতীয়বারের মতো প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (PSG) কাছে স্বপ্নভঙ্গ হলো লিভারপুলের। উসমান দেম্বেলে যেন অলরেডদের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। গত মৌসুমেও এই দেম্বেলের গোলেই কপাল পুড়েছিল লিভারপুলের, আর এবার ফিরতি লেগে তাঁর জোড়া গোলেই ৪-০ ব্যবধানে (দুই লেগ মিলিয়ে) বিধ্বস্ত হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেল অলরেডরা। ম্যাচে পিএসজির ২-০ জয়ের দিনে Dembele আরও একবার প্রমাণ করলেন কেন তিনি বর্তমান ব্যালন ডি’অর জয়ী।
এই বিপর্যয়ের পর লিভারপুল কোচ আর্নে স্লটের ভবিষ্যৎ এখন সুতোয় ঝুলছে। বিতর্কিত দল নির্বাচন আর কৌশলগত ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ সমর্থকরা এখন স্লটের বিদায় ঘণ্টা শুনতে পাচ্ছেন।
বিজয়ী: উসমান দেম্বেলের ‘ব্যালন ডি’অর’ দাপট
আর্নে স্লট ম্যাচের পর একটি কথা অন্তত সঠিক বলেছেন, “দেম্বেলের গোলই বুঝিয়ে দিয়েছে কেন তিনি গত মৌসুমে ব্যালন ডি’অর জিতেছেন।” ম্যাচের ৭২ মিনিটে যখন লিভারপুল একের পর এক আক্রমণ করে পিএসজিকে চেপে ধরেছিল, ঠিক তখনই একক নৈপুণ্যে দুর্দান্ত এক গোল করে অ্যানফিল্ডকে স্তব্ধ করে দেন দেম্বেলে।
পুরো ম্যাচে হয়তো খুব বেশি সচল ছিলেন না, কিন্তু সঠিক সময়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন এই ফরাসি তারকা। শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগ মুহূর্তে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে লিভারপুলের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেন তিনি। সামনে বিশ্বকাপ, আর এমন ফর্মে থাকা দেম্বেলে নিশ্চিতভাবেই দ্বিতীয়বার ব্যালন ডি’অরের দাবিদার।
আরও পড়ুন: লিভারপুল শেষে সালাহর সামনে তিন পথ: সৌদি, মেসি বা ইতালি!
ব্যর্থতা: হুগো একিটিকের বিশ্বকাপ স্বপ্ন চুরমার
লিভারপুলের জন্য রাতটি কেবল হারের ছিল না, ছিল বড় এক দুঃসংবাদেরও। ম্যাচের ৩০ মিনিট পার হতেই কোনো সংঘর্ষ ছাড়াই মাঠে লুটিয়ে পড়েন ফরাসি ফরোয়ার্ড হুগো একিটিক। তাঁর অভিব্যক্তি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল চোট কতটা গুরুতর।
স্লট ম্যাচ শেষে স্বীকার করেছেন, একিটিকের অ্যাকিলিস টেন্ডনের চোটের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। এর ফলে আসন্ন বিশ্বকাপে ফ্রান্সের হয়ে খেলার স্বপ্ন হয়তো শেষ হয়ে গেল এই তরুণ প্রতিভার। ইব্রাহিমা কোনাতেও সতীর্থের এই অবস্থায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
বিজয়ী: অতন্দ্র প্রহরী মারকুইনহোস
গোলগুলো দেম্বেলে করলেও পিএসজির জয়ের আসল নায়ক সম্ভবত অধিনায়ক মারকুইনহোস। বিশেষ করে ম্যাচের ৩০ মিনিটে গোললাইন থেকে ভার্জিল ফন ডাইকের নিশ্চিত গোল যেভাবে তিনি ব্লক করেছেন, সেটি ছিল অবিশ্বাস্য।
ওই মুহূর্তে Liverpool গোল পেলে ম্যাচের মোড় ঘুরে যেতে পারত। পুরো ম্যাচে রক্ষণে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে থেকে পিএসজিকে ক্লিনশিট এনে দিয়েছেন এই ব্রাজিলিয়ান।
ব্যর্থতা: আর্নে স্লটের ‘অস্তিত্বের সংকট’
এই হারের পর আর্নে স্লটের বিদায় এখন সময়ের ব্যাপার বলে মনে করা হচ্ছে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং এফএ কাপ—উভয় টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ৪-০ ব্যবধানে বিদায় নেওয়া লিভারপুলের মতো ক্লাবের জন্য মানহানিকর। অ্যানফিল্ডের এই ম্যাচে স্লটের দল নির্বাচন ছিল যাচ্ছেতাই।
আরও পড়ুন: অ্যানফিল্ডে লিভারপুলের সূর্য কি অস্তমিত? আর্নে স্লটের রাজত্বে ৭টি গভীর ফাটল
হাফ-ফিট আলেকজান্ডার ইসাককে খেলানো এবং মোহাম্মদ সালাহ ও রিও এনগুমোহাকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার সিদ্ধান্তকে ‘লুডিক্রাস’ বা হাস্যকর বলে অভিহিত করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা। গত গ্রীষ্মে বিশাল বিনিয়োগের পর লিগ টেবিলে পঞ্চম স্থানে থাকা এবং ইউরোপ থেকে এভাবে বিদায় নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ছায়া হয়ে আছেন জাবি আলোনসো
স্লটের প্রতিটি ব্যর্থতা যেন গ্যালারিতে জাবি আলোনসোর চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। রিয়াল মাদ্রিদ থেকে বিদায়ের পর আলোনসো এখন মুক্ত। সমর্থকদের বিশ্বাস, স্লট যা পারেননি, আলোনসো ফিরলে লিভারপুল সেই হারানো গৌরব ফিরে পাবে। লিভারপুল বোর্ড যদি এখনই ব্যবস্থা না নেয়, তবে এই মরসুমের বাকি সময়টা হবে স্রেফ সময়ের অপচয়।
লিভারপুলের ফুটবল এখন যেন এক ‘অরওয়েলিয়ান’ দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার রাতের এই বিভীষিকা সম্ভবত অ্যানফিল্ডে কোচ হিসেবে স্লটের শেষ ইউরোপীয় রাত হয়ে থাকবে।

