মাঠে এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি হয়, যা আমরা স্রেফ চোখের দেখায় মনে রাখি। আর কিছু মুহূর্তের মাহাত্ম্য লুকিয়ে থাকে তার পেছনের গল্পে। রোনালদিনহোর ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টিই বেশি প্রযোজ্য। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ডকুমেন্টারি সিরিজ ‘রোনালদিনহো: দ্য ওয়ান অ্যান্ড অনলি’-তে ব্রাজিলিয়ান এই জাদুকর তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ‘মায়াবী ম্যাজিক’ ফ্রি-কিক নিয়ে এক চমকপ্রদ তথ্য ফাঁস করেছেন।
সেইসব বিখ্যাত গোল, যেখানে Ronaldinho বলটিকে দেওয়ালের ওপর দিয়ে না পাঠিয়ে নিচ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন—সেটি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না।
পাগলামি না কি শৈল্পিক ভাবনা?
ফ্রি-কিক নেওয়ার সময় মানব দেওয়াল বা ‘ওয়াল’ যখন লাফিয়ে ওঠে, ঠিক সেই মুহূর্তেই মাটির কোল ঘেঁষে বল জালে জড়ানো—এটি শুনতে যতটা রোমাঞ্চকর, বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন। রোনালদিনহো জানান, এই আইডিয়াটি যখন তাঁর মাথায় আসে, অনেকে একে নিছক ‘পাগলামি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
রোনালদিনহো বলেন, “আমি অনুশীলনের সময় বারবার এটি চেষ্টা করতাম। একদম সূক্ষ্ম জায়গাগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম যেখান দিয়ে বলটি যেতে পারে।”
শুরুতে সতীর্থ বা কোচিং স্টাফের অনেকে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিলেও, রোনালদিনহো জানতেন সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছেন তিনি।
সাধনার নিখুঁত বাস্তবায়ন
মাঠে যখন সেই সুযোগটি আসতো, রোনালদিনহো খুব শান্তভাবে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রতিপক্ষের বাধার দেওয়াল বল আটকাতে নিশ্চিতভাবেই লাফ দেবে। আর ঠিক সেই এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়েই মাটির ওপর যে ফাঁকা জায়গাটি তৈরি হবে, সেখানেই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
মায়াবী ফ্রি-কিকে গোল হওয়ার পর গোটা ফুটবল বিশ্ব তাঁর কৌশলের প্রশংসা করেছিল। কিন্তু ডকুমেন্টারিতে রোনালদিনহো স্পষ্ট করেছেন, এটি কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া (Reaction) ছিল না, বরং এটি ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের সাধনা।
তঁর মতে, “সবকিছুই যে স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, তা নয়। অনেক কিছুই আগে থেকে ভাবা থাকত। শুধু সেই মুহূর্তটির প্রয়োজন ছিল যখন অসম্ভব বলে মনে হওয়া বিষয়গুলোও সম্ভব হয়ে উঠবে।”
রোনালদিনহোর অমর ফ্রি-কিকগুলো
রোনালদিনহোর এই বিশেষ ধরনের ফ্রি-কিক বা ‘আন্ডার দ্য ওয়াল’ টেকনিক ফুটবল ইতিহাসে একটি ট্রেন্ড সেট করে দিয়েছিল। এর মধ্যে দুটি এখনও ফুটবল দর্শকদের চোখে ভাসে।
Barcelona বনাম ওয়ের্ডার ব্রেমেন (২০০৬): চ্যাম্পিয়নস লিগের সেই গোলটি আজও ফুটবল ভক্তদের চোখে ভাসে।
ফ্ল্যামেঙ্গো বনাম Santos (২০১১): ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে এসেও সান্তোসের বিপক্ষে একই কায়দায় গোল করে নিজের জাদুর প্রমাণ দিয়েছিলেন তিনি।
রোনালদিনহোর এই স্বীকারোক্তি আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, কেন তাঁকে ‘ফুটবল জাদুকর’ বলা হয়। মাঠের প্রতিটি ড্রিবল বা শট ছিল তাঁর গভীর চিন্তাশক্তি আর পরিশ্রমের ফসল, যা দর্শকদের কাছে মনে হতো স্রেফ মায়া।

