ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট কার মাথায় উঠবে—দুই দশক পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জিতে উড়তে থাকা আর্সেনাল, নাকি ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)? এই মহা প্রশ্নের উত্তর মিলবে আজ। হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ব্লকবাস্টার ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের এই দুই পরাশক্তি। দীর্ঘ ২২ বছর পর ঘরোয়া লিগের শিরোপা পুনরুদ্ধার করা গানার্সদের সামনে আজ ক্লাব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের সুবর্ণ সুযোগ। অন্যদিকে, পিএসজি ডাগআউটে বসে লুইস এনরিকে লড়ছেন টানা দ্বিতীয়বার ইউরোপের সিংহাসন ধরে রেখে ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যে।
১৩ মাস আগে এই দুই দল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল, যেখানে দুই লেগ মিলিয়ে আর্সেনালকে বিদায় করে ফাইনালে উঠেছিল পিএসজি।
তবে এক বছরের ব্যবধানে মিকেল আর্তেতার আর্সেনাল নিজেদের পুরোপুরি বদলে ফেলেছে। ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করে স্কোয়াডের গভীরতা বাড়ানো আর্সেনাল এখন অনেক বেশি গতিশীল ও শারীরিক শক্তিসম্পন্ন ফুটবল খেলছে। ভিক্টর গাইওকেরেস ও কাই হাভার্টজের অন্তর্ভুক্তি গানার্সদের আক্রমণভাগকে করেছে আরও ধারালো। তবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন পিএসজিও রয়েছে তাদের চেনা ছন্দে। গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মার জায়গায় মেটভে সাফোনভ পোস্টের নিচে দাঁড়ালেও দলটির আক্রমণভাগ এখনো যেকোনো রক্ষণভাগ ভেঙে চুরমার করার সামর্থ্য রাখে।
আরও পড়ুন:
চ্যাম্পিয়নস লিগে বায়ার্নকে বিদায় করে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে পিএসজি
ক্লাসিক বনাম ফিউচারিস্টিক: ট্যাকটিক্যাল লড়াই
ট্যাকটিক্যাল দিক থেকে এই ম্যাচটিকে দেখা হচ্ছে ‘ক্ল্যাসিক’ বনাম ‘ফিউচারিস্টিক’ ফুটবলের লড়াই হিসেবে।
আর্তেতার আর্সেনাল শারীরিক শক্তি, রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা এবং সেট-পিস বা কর্নার কিক থেকে গোল আদায়ের দিক থেকে এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা। অন্যদিকে, লুইস এনরিকের পিএসজি খেলছে ‘ফ্রি-ফ্লোইং’ বা মুক্ত ধাঁচের পজিশন-ভিত্তিক ফুটবল, যা একসময়ের পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনাকে মনে করিয়ে দেয়। যেখানে নুনিও মেন্দেসের মতো লেফট-ব্যাক যেমন আক্রমণে ঝড় তুলতে পারেন, ঠিক তেমনি খিচা কভারাতসখেলিয়া বা উসমান ডেম্বেলের মতো উইঙ্গাররা নিচে নেমে রক্ষণে সাহায্য করতে পারেন।
আজকের ফাইনালে আর্সেনালের মূল ভরসা থাকবে বুকায়ো সাকা, ডিক্লান রাইস এবং ডিফেন্সের প্রধান দেয়াল উইলিয়াম সালিবার ওপর। বিশেষ করে সেট-পিস থেকে পিএসজির নতুন গোলরক্ষক সাফোনভকে চাপে ফেলে গোল আদায় করাই হবে আর্তেতার মূল কৌশল। অপরদিকে, পিএসজির জয়ের চাবিকাঠি থাকবে চলতি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ১০ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট করা খিচা কাভারাস্কেইয়ার পায়ে। আর্সেনালের রক্ষণভাগের ইনজুরি সমস্যার কারণে রাইট-ব্যাকে ক্রিশ্চিয়ান মস্কেরাকে খেলতে হতে পারে, আর এই দুর্বল জায়গায় মেন্দেস ও কাভারাস্কেইয়ার জুটি আঘাত হানলে কপাল পুড়তে পারে ইংলিশ চ্যাম্পিয়নদের।
শিরোপার মহাতাৎপর্য ও ঐতিহাসিক সমীকরণ
আজকের জয় আর্সেনালের ৯৬ বছরেরও বেশি ক্লাব ইতিহাসে এক অমর অধ্যায় যোগ করবে।
এর আগে ২০০৬ সালে তারা একবারই ফাইনালে উঠেছিল, কিন্তু বার্সেলোনার কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল। আজ জিতলে ২০০৩-০৪ মৌসুমের বিখ্যাত ‘ইনভিন্সিবল’ দলকেও ছাড়িয়ে যাবে বর্তমান স্কোয়াড।
অন্যদিকে, পিএসজি আজ জিতলে রিয়াল মাদ্রিদ, বায়ার্ন মিউনিখ বা লিভারপুলের মতো এলিট ক্লাবে যোগ দেবে, যারা ইউরোপিয়ান কাপ বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে টানা দুই বছর শিরোপা ধরে রাখার কীর্তি গড়েছে। আর কোচ লুইস এনরিকে পাবেন তাঁর ক্যারিয়ারের তৃতীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা, যা তাকে পেপ গার্দিওলা ও কার্লো আনচেলত্তির মতো কিংবদন্তি কোচদের কাতারে নিয়ে যাবে।
ওপ্টা ও ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্সেনালের ফিজিক্যাল ফুটবলের চেয়ে পিএসজির হাই-টেকনিক্যাল ফুটবল আজ কিছুটা এগিয়ে থাকবে, তবে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করবে মাঠের ছোট ছোট ভুলগুলোই।
আরও পড়ুন:
২০ বছর পর যেভাবে ‘রাজকীয়ভাবে’ ইউরোপ জয়ের পথে আর্সেনাল

