দুই বছর আগে রাওয়ালপিন্ডিতে যা ঘটেছিল, তা ছিল রূপকথার মতো। পাকিস্তানের মাটিতে তাদেরই ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে টেস্ট সিরিজ জয়—বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। সেই সিরিজ হার পাকিস্তান ক্রিকেটকে এতটাই ওলট-পালট করে দিয়েছিল যে, কিংবদন্তি ওয়াসিম আকরাম একে ‘বিব্রতকর’ আখ্যা দিয়েছিলেন। আগামী ৮ মে, মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে যখন আবার দুই দল সাদা পোশাকে মুখোমুখি হচ্ছে, তখন সেই রাওয়ালপিন্ডির সুখস্মৃতিই টাইগারদের প্রধান জ্বালানি।
স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন শুরু
গত নভেম্বর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর প্রায় ছয় মাস টেস্ট ক্রিকেট খেলেনি বাংলাদেশ। মাঝখানের এই সময়টায় দেশের ক্রিকেটে অনেক ঝড় বয়ে গেছে—বিসিবি সভাপতি বদল থেকে শুরু করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ব্যর্থতা। তবে সব অস্থিরতা কাটিয়ে বর্তমান প্রধান কোচ ফিল সিমন্সের অধীনে এক নতুন মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামছে স্বাগতিকরা। পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাম্প্রতিক ওয়ানডে সিরিজ জয় দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ।
অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর মতে, ২০১৪ সালের পাকিস্তান সফরের প্রস্তুতির মতোই এবারও তারা কোমর বেঁধে নেমেছেন।
শান্ত বলেন, “২০২৪ সালের সেই সফরে আমাদের প্রস্তুতি ছিল আমার দেখা সেরা। এবারও আমরা সেই একই কঠোর পরিশ্রম করছি। রাওয়ালপিন্ডিতে ২৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পরও যেভাবে আমরা ফিরে এসেছিলাম, সেই অদম্য জেদ আমাদের ড্রেসিংরুমে এখনো আছে।”
“আমি অধিনায়কত্ব উপভোগ করছি এবং মুশফিক ভাই, মুমিনুল ভাইদের মতো অভিজ্ঞদের পরামর্শ আমাকে অনেক সাহস দিচ্ছে।”
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ খেলতে ঢাকায় পাকিস্তান দল
সবুজ উইকেটে পেস বিপ্লবের হাতছানি
মিরপুরের উইকেট মানেই প্রথাগতভাবে স্পিন-ফাঁদ। কিন্তু গত ৪-৫ বছর ধরে সাদা বলের ক্রিকেটে বাংলাদেশের পেসাররা যে বিপ্লব ঘটিয়েছেন, তার ছাপ পড়তে যাচ্ছে টেস্টেও। কিউরেটর টনি হেমিং এবার তৈরি করেছেন এক ‘স্পোর্টিং উইকেট’, যেখানে ঘাসের ছোঁয়া আছে। বাংলাদেশ দল এবার স্পিন-নির্ভরতা কমিয়ে তিন পেসার নিয়ে খেলার পরিকল্পনা করছে।
তাসকিন আহমেদ, শরীফুল ইসলাম, নাহিদ রানা, ও ইবাদত হোসেনদের নিয়ে গড়া পেস আক্রমণ এখন বিশ্বের যেকোনো দলের জন্য চিন্তার কারণ।
তাসকিন বলছেন, “আমাদের পেস ইউনিট এখন অনেক বেশি ধারাবাহিক। একে অপরের পরিপূরক হিসেবে বোলিং করছি আমরা।”
“আল্লাহর রহমতে এখন আমাদের পেস ইউনিটে অনেক বৈচিত্র্য আছে। আমাদের মধ্যে একটা দারুণ বন্ধন তৈরি হয়েছে। আমরা এখন শুধু রক্ষণাত্মক বোলিং নয়, বরং ম্যাচ জেতানোর মতো স্পেল করার ক্ষমতা রাখি। উইকেট যদি কিছুটা স্পোর্টিং হয়, তবে পেসারদের ভেতর থেকে সেই বাড়তি প্রচেষ্টা এমনিতেই চলে আসে।”
তানজিদ ও অমিতের আগমন
দীর্ঘদিন ধরে টেস্টে ওপেনিং জুটির ধারাবাহিকতাহীনতা বাংলাদেশের বড় মাথা ব্যথার কারণ। এই সমস্যার সমাধানে নির্বাচকরা এবার বেছে নিয়েছেন আক্রমণাত্মক ওপেনার তানজিদ হাসান তামিমকে। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে নিজেকে প্রমাণ করা তানজিদের এবার টেস্ট অভিষেক হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
এছাড়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রায় ৫০ গড় থাকা অমিত হাসানকেও খেলানোর কথা ভাবছে টিম ম্যানেজমেন্ট। তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার মিশেলে এক আধুনিক টেস্ট ব্যাটিং লাইনআপ গড়ার পথে বাংলাদেশ।
নির্বাচক হান্নান সরকারের মতে, তানজিদ অনেকটা ডেভিড ওয়ার্নারের মতো দ্রুত রান তোলার ক্ষমতা রাখেন, যা আধুনিক টেস্ট ক্রিকেটের জন্য জরুরি। অন্যদিকে, অমিত হাসানকে নিয়ে মিডল অর্ডারে ভরসা খুঁজছে টিম ম্যানেজমেন্ট।
অমিত তাঁর অনুভূতি জানিয়ে বলেছেন, “জাতীয় দলের ড্রেসিংরুম অন্য রকম এক ভালো লাগার জায়গা। সুযোগ পেলে নিজের সেরাটা দেওয়ার জন্য আমি প্রস্তুত।”
অভিজ্ঞ ব্যাটিং বনাম বোলিং শক্তির লড়াই
অভিজ্ঞতার বিচারে বাংলাদেশ দল বর্তমানে অনন্য উচ্চতায়। মুশফিকুর রহিমের ১০০ টেস্টের অভিজ্ঞতা, মুমিনুল হকের ৭৫ ম্যাচ, আর লিটন-মিরাজ-তাইজুলদের পঞ্চাশোর্ধ্ব ম্যাচের অভিজ্ঞতা দুই দলের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
বিপরীতে পাকিস্তান দলও ছেড়ে কথা বলার পাত্র নয়। বাবর আজমের ফেরা এবং শাহীন আফ্রিদি-হাসান আলীদের অভিজ্ঞ বোলিং বিভাগ বাংলাদেশের অভিজ্ঞ ব্যাটারদের কঠিন পরীক্ষা নেবে।
টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের নতুন চক্রে ঘরের মাঠের ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার এটিই সেরা সুযোগ। রাওয়ালপিন্ডির সেই দাপট কি মিরপুরের ঘাসহীন বা সবুজ উইকেটে দেখা যাবে? উত্তর সময়ের হাতে।
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশ সিরিজে পাকিস্তান দলে ৪ নতুন মুখ, খেলা হবে ঢাকা ও সিলেটে

