তাঞ্জিয়ারের রাত। শেষ বাঁশি বাজার পরও মোহামেদ সালাহর চোখে জল নেই। নেই কোনো ভেঙে পড়ার দৃশ্য। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি—যেটার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল গভীর হতাশা, হাহাকার। আরেকটি আফ্রিকা কাপ অব নেশনস, আরেকটি স্বপ্নভঙ্গ!
সেমিফাইনালে আবারও বাধা হয়ে দাঁড়াল সেনেগাল। আবারও সামনে সাদিও মানে—একসময় লিভারপুলে সালাহর সবচেয়ে পরিচিত সঙ্গী। ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস, আফ্রিকান মঞ্চে বারবার একই গল্প ফিরে আসে!
মরক্কোয় খেলানো পাঁচ ম্যাচে চার গোল করে মিশরকে শেষ চারে তুলেছিলেন ৩৩ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। আইভরি কোস্টকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল পেরোনোর পর নিজেই বলেছিলেন, এটি তার ক্যারিয়ারের “সেরা ক্যাম্প”। দলগত বন্ধন, পারস্পরিক ভালোবাসা, অনুশীলনের তীব্রতা—সব মিলিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন সালাহ।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রফির স্বপ্ন আরেকবার অধরাই রইল।
এখন তার সামনে ফেরার পথ—মার্সিসাইডে। তবে লিভারপুলে ফেরা মানেই সব প্রশ্নের উত্তর নয়। বরং ক্লাব ফুটবলে তার ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
গত ২৬ নভেম্বরের পর সালাহ আর লিভারপুলের শুরুর একাদশে নেই। পিএসভির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেই ম্যাচের পর থেকেই বদলে যায় দৃশ্যপট। এই সময়ে লিভারপুল অপরাজিত থাকলেও পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোচ আর্নে স্লট নিজেও স্বীকার করেছেন, দলের ফুটবল অনেক সময় নিষ্প্রাণ লাগছে।
এর মধ্যেই লিডসে দেওয়া এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে সালাহ অভিযোগ তুলেছিলেন—টানা তিন ম্যাচ বেঞ্চে বসিয়ে তাকে “বলির পাঁঠা” বানানো হয়েছে। সেখান থেকেই কোচের সঙ্গে দূরত্বের গুঞ্জন।
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয় ব্রাইটনের বিপক্ষে ম্যাচে। ইনজুরির কারণে প্রথমার্ধেই নামেন সালাহ, অ্যাসিস্ট করেন, দর্শকদের কাছ থেকে পান উষ্ণ অভ্যর্থনা। ম্যাচ শেষে চার দিকের গ্যালারিতে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান ‘ইজিপশিয়ান কিং’। সেটিই আফকনের আগে তার শেষ লিভারপুল ম্যাচ।
পরবর্তীতে কোচ স্লট জানান, দলে কোনো অমীমাংসিত সমস্যা নেই। সতীর্থদের কাছে সাক্ষাৎকারজনিত বিভ্রান্তির জন্য সালাহ ক্ষমাও চেয়েছেন বলে জানা যায়।
তার অনুপস্থিতিতে লিভারপুল হারেনি ঠিকই, তবে ইনজুরির তালিকা দীর্ঘ হয়েছে। আলেকজান্ডার ইসাক অন্তত মার্চ পর্যন্ত বাইরে, কনর ব্র্যাডলির মৌসুম শেষ। এই বাস্তবতায় সালাহর ফেরাটা লিভারপুলের জন্য স্বস্তির।
তবে তিনি সঙ্গে সঙ্গে খেলবেন না। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় দলের শেষ ম্যাচের পরদিন পর্যন্ত খেলোয়াড় ক্লাবে যোগ দিতে পারেন না। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলার পর রোববার যুক্তরাজ্যে ফিরবেন সালাহ।
সব মিলিয়ে আগামী সপ্তাহে মার্সেইয়ের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগ ম্যাচেই তার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
কিন্তু বড় প্রশ্ন—এরপর কী?
আফকনের সেমিফাইনালের আগে সালাহ বলেছিলেন, “এই ট্রফি জিততে আমার চেয়ে বেশি কেউ চায় না। ফুটবলে এই একটাই শিরোপা আমার নেই।”
২০২১ সালের ফাইনালে পেনাল্টি নেওয়ার সুযোগ পাননি। ২০২৩ সালে ইনজুরিতে টুর্নামেন্ট ছাড়েন। আফকন যেন বারবার তার স্বপ্ন ভাঙার মঞ্চ।
পরবর্তী আফকন ২০২৭ সালে। তখন তার বয়স হবে ৩৫। সেই গ্রীষ্মেই শেষ হবে লিভারপুলের সঙ্গে বর্তমান চুক্তি। তবু শারীরিক সক্ষমতায় কোনো ঘাটতি নেই তার।
এখন লিভারপুল তাকে চাইবে—বিশেষ করে এই ইনজুরি সংকটে। ডান প্রান্তে, মাঝমাঠের পেছনে কিংবা প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় স্ট্রাইকার হিসেবেও দেখা যেতে পারে তাকে।
তবে এক বিষয় পরিষ্কার—মোহামেদ সালাহ বেঞ্চে বসে থাকার খেলোয়াড় নন।
সাদিও মানের মতোই বয়সের ভার সামলে মধ্যপ্রাচ্যে সফল হওয়ার উদাহরণ সামনে আছে। সেই পথ কি সালাহও বেছে নেবেন? নাকি লিভারপুলেই শেষ অধ্যায় লিখবেন?
উত্তর এখনো ভবিষ্যতের হাতে।

