মাঠে সান্তোসের জার্সিতে ব্রাজিল তারকা নেইমার।ব্রাজিল ফুটবলের অন্যতম মহাতারকা নেইমার। ছবি: গেটি

খবরটি নতুন নয়, তবে অপেক্ষা ছিল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সান্তোস নিশ্চিত করেছে—আরও এক বছরের জন্য ক্লাবটির সঙ্গেই থাকছেন নেইমার। ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী এই ক্লাবেই আগামী মৌসুম কাটাবেন দেশের সর্বোচ্চ তারকা।

চুক্তি নবায়নের পর নিজের অনুভূতি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন নেইমার। তিনি বলেন, “২০২৬ এসেছে। আমার ভাগ্য এর চেয়ে ভিন্ন হতে পারত না। সান্তোসই আমার জায়গা। এখানে আমি ঘরে আসার মতো নিরাপদ এবং সুখী বোধ করি। এই ক্লাবে আমি বাকি স্বপ্নগুলো অর্জন করতে চাই।”

এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে নেইমারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ইঙ্গিত। সামনে ২০২৬ বিশ্বকাপ। সময় খুব বেশি নেই। আর সেই লক্ষ্যেই সান্তোসে থাকার সিদ্ধান্ত।

বর্তমানে নেইমার রয়েছেন পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে। বাঁ পায়ের আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারির পর ধীরে ধীরে সুস্থতার পথে হাঁটছেন তিনি। মঙ্গলবার বাবার সঙ্গে রেই পেলি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে গিয়ে ক্লাবের চিকিৎসাকেন্দ্রে ফিজিওথেরাপি নেন। ক্লাব সূত্রের আশা, জানুয়ারির শেষ দিকে পুরোপুরি ফিট হবেন তিনি এবং ফেব্রুয়ারির শুরুতেই মাঠে ফিরতে পারবেন।

এই নতুন চুক্তিটি সান্তোসের সঙ্গে নেইমারের তৃতীয় দফার সমঝোতা। গত বছরের জানুয়ারিতে ছয় মাসের জন্য ক্লাবটিতে ফিরেছিলেন তিনি। এরপর জুনে আরও ছয় মাস চুক্তি বাড়ানো হয়। এবার ১২ মাসের নতুন চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পর, যেখানে দুই পক্ষই নিজেদের শর্তে সমাধানে পৌঁছেছে।

তবে প্রশ্নটা চুক্তির মেয়াদ নয়, সময়ের গুরুত্ব। বিশ্বকাপের আর এক বছরেরও কম সময় বাকি থাকতে নেইমারের এই সিদ্ধান্ত কী বার্তা দিচ্ছে?

ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে নেইমারের শেষ ম্যাচ ২০২৩ সালের অক্টোবরে। অর্থাৎ দুই বছরেরও বেশি সময় জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নামা হয়নি তাঁর। মাঝেমধ্যে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হলেও চোট আর ফিটনেসের ধাঁধায় তা বাস্তবায়িত হয়নি।

ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি এ ব্যাপারে কোনো ছাড়ের বার্তা দেননি। তাঁর অবস্থান স্পষ্ট—ফিটনেস না থাকলে দলে জায়গা নেই, নাম যত বড়ই হোক। ফলে সান্তোসের হয়ে সামনে যে ম্যাচগুলো খেলবেন নেইমার, সেগুলোই হবে তাঁর বিশ্বকাপের দাবির সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

প্রতিভা বা সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন নেই। ফিট নেইমারকে যে কোনো কোচই দলে চাইবেন। সমস্যা একটাই—‘ফিট নেইমার’। ক্যারিয়ারের বড় অংশজুড়ে তাঁকে লড়াই করতে হয়েছে চোট আর পুনর্বাসনের সঙ্গে। দুই বছরের বেশি সময় আগের চোটের ধাক্কা এখনো জাতীয় দলে ফেরার পথ আটকে রেখেছে।

এই মুহূর্তে নেইমারের প্রধান চ্যালেঞ্জ পুনর্বাসন শেষ করে মাঠে ফেরা এবং বিশ্বকাপের আগপর্যন্ত বড় কোনো চোট এড়িয়ে চলা। সেটি করতে পারলে সান্তোসের হয়ে নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবেন তিনি, যা তাঁর ছন্দ ও আত্মবিশ্বাস ফেরাতে সহায়ক হবে।

এরপর আসবে পারফরম্যান্সের চাপ। শুধু খেললেই হবে না, প্রমাণ দিতে হবে। প্রস্তুতি ম্যাচে জায়গা করে নিতে হবে, জাতীয় দলের কাঠামোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। এখানেই আসে আরেকটি বাস্তবতা—ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের তুলনায় ব্রাজিলিয়ান লিগের মান তুলনামূলক নিচু। ফলে আনচেলত্তি নেইমারের পারফরম্যান্স বিচার করবেন বাড়তি সতর্কতায়।

তবে আশার জায়গাও আছে। গত মৌসুমের শেষ দিকে চোট নিয়েই মাঠে নেমে দলকে অবনমন থেকে বাঁচাতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন নেইমার। সেই নিবেদন আর দায়বদ্ধতার পুনরাবৃত্তিই এখন ব্রাজিল কোচের প্রত্যাশা।

সব মিলিয়ে নেইমারের সামনে কাজগুলো খুব জটিল নয়—পারফর্ম করা, দলে জায়গা করে নেওয়া, নতুন দলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন কাজ একটাই—ফিট থাকা। ভাগ্য সহায় হলে, এই একটি বাধা পার হতে পারলেই বাকি সমীকরণগুলো সহজ হয়ে যেতে পারে।