বাংলাদেশ ফুটবল লিগের ম্যাচে বিদেশি ফুটবলারদের লড়াই

বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে পাকিস্তানি ফুটবলার—এই শব্দযুগল বহুদিন ধরেই যেন কেবল স্মৃতির পাতায় বন্দী ছিল। সত্তরের দশকের শেষ ভাগের পর আর কখনোই বাংলাদেশের লিগে দেখা যায়নি পাকিস্তানের কোনো ফুটবলারকে। তবে সেই দীর্ঘ বিরতি ভাঙতে যাচ্ছে চলতি মৌসুমের মাঝপথেই। সার্ক কোটার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আবারও বাংলাদেশের ফুটবল লিগে পা রাখতে চলেছেন পাকিস্তানের খেলোয়াড়রা।

চলতি মৌসুমের প্রথম পর্বে সার্কভুক্ত দেশগুলো থেকে মোট ১২ জন ফুটবলার বিভিন্ন ক্লাবে নাম লেখান। নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার খেলোয়াড়দের উপস্থিতি থাকলেও পাকিস্তানের কেউ ছিলেন না। দ্বিতীয় পর্ব সামনে রেখে সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে নবাগত ক্লাব পিডব্লিউডি। স্থানীয় কোটায় তারা দুজন পাকিস্তানি ফুটবলারকে চুক্তিবদ্ধ করেছে, যা বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে একেবারেই ব্যতিক্রমী ঘটনা।

বাংলাদেশ ফুটবলের অতীত স্মরণ করতে গিয়ে মোহামেডানের সাবেক ফুটবলার ও কোচ গোলাম সারোয়ার টিপু জানান, পাকিস্তানি ফুটবলারদের শেষবার দেখা গিয়েছিল স্বাধীনতার পরের কয়েক বছরেই।

তাঁর ভাষায়, “১৯৭৭ সালে ঢাকা মোহামেডানে খেলেছিলেন কালা গফুর, ফজল ও আশিক। গফুর পুরো মৌসুম খেলেন। পরে আমির বক্সও সাদা-কালো জার্সিতে নামেন। আশির দশক থেকে আর কেউ আসেননি।”

অর্থাৎ প্রায় চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের লিগ পাকিস্তানি ফুটবলারশূন্য ছিল।

এই ঐতিহাসিক শূন্যতা ভাঙতে যাঁরা আসছেন, তাঁদের একজন ২১ বছর বয়সী গোলকিপার উসমান আলী। পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে খেলা এই তরুণ সর্বশেষ দেশটির ঘরোয়া লিগে রাওয়ালপিন্ডির খান রিসার্চ ল্যাবরেটরিজের জার্সিতে খেলেছেন। অন্যজন অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার আলী উজাইর মাহমুদ। পাকিস্তান জাতীয় দলের হয়ে ২১টি ম্যাচ খেলা ২৯ বছর বয়সী এই ফুটবলার গত মৌসুমে মালদ্বীপের হোয়ানদেধু এফসিতে ধারে খেলেছেন।

পিডব্লিউডির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পাকিস্তানের দিকে ঝোঁকার পেছনে বাস্তব কারণ ছিল।

“আমরা শুরুতে নেপালি খেলোয়াড় খুঁজছিলাম। কিন্তু নেপালের লিগ শুরু হয়ে যাওয়ায় সেখানে কম পারিশ্রমিকে মানসম্মত খেলোয়াড় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তখন পাকিস্তানের বাজারে নজর দিই। দুজনের সঙ্গেই চুক্তি হয়ে গেছে।”

পাকিস্তানি ফুটবলার আনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিল ব্রাদার্স ইউনিয়নও। লিগের প্রথম পর্বে চার নেপালি খেলোয়াড় নিয়ে দল গড়েছিল ক্লাবটি। তবে মধ্যবর্তী দলবদলের সময় নেপালের লিগে ফিরে যাওয়ায় শূন্যতা তৈরি হয়। পরে অঞ্জন বিস্তা ও সুনীল শ্রেষ্ঠা আবার ব্রাদার্সে ফিরতে চাইলেও পাকিস্তানের তিন ফুটবলার—মোহাম্মদ ওমর হায়াত, আবদুল্লাহ শাহ ও শায়াক দোস্তের সঙ্গে আলোচনার খবর শোনা যায়। শেষ পর্যন্ত নেপালি খেলোয়াড়দের ফেরার সম্ভাবনা বাড়ায় পাকিস্তানিদের আনার সুযোগ ক্ষীণ হয়ে গেছে বলে জানান ক্লাবটির ম্যানেজার আমের খান।

পুলিশ এফসিও পাকিস্তানের দিকে না গিয়ে ভুটানেই থেমেছে। তারা ভুটান জাতীয় দলের লেফটব্যাক শেরুপ দর্জিকে চূড়ান্ত করেছে। অন্যদিকে প্রথম পর্বে চমক দেখানো ফর্টিস এফসি ভুটান জাতীয় দলের তারকা ও দেশটির সর্বশেষ লিগের সেরা খেলোয়াড় দাওয়া শেরিংকে দলে ভিড়িয়েছে।

মধ্যবর্তী দলবদলে ছোট ও মাঝারি ক্লাবগুলোর এই সক্রিয়তার বিপরীতে বড় তিন ক্লাব বসুন্ধরা কিংস, আবাহনী লিমিটেড ও মোহামেডান স্পোর্টিং কার্যত হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আছে। বিদেশি খেলোয়াড় ও কোচদের বকেয়া পরিশোধ না করায় ফিফা এই তিন ক্লাবের ওপর নতুন খেলোয়াড় নিবন্ধনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে—যা দেশের ফুটবলে নজিরবিহীন ঘটনা। বকেয়া শোধ হলেই কেবল তারা নতুন বিদেশি নিতে পারবে।

এ অবস্থায় লিগের দ্বিতীয় পর্ব ঘিরে অনিশ্চয়তাও কাটেনি। ৩১ জানুয়ারি মধ্যবর্তী দলবদলের সময়সীমা শেষ হলেও দ্বিতীয় পর্ব কবে শুরু হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের কারণে বাফুফে প্রথম রাউন্ডের সূচি প্রত্যাহার করেছে। এই অনিশ্চয়তার জেরে মোহামেডান ও ব্রাদার্সসহ কয়েকটি ক্লাব অনুশীলনও বন্ধ রেখেছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের প্রত্যাবর্তন শুধু একটি দলবদলের খবর নয়; এটি দেশের ঘরোয়া ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। মাঠের পারফরম্যান্সে এই প্রত্যাবর্তন কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।