এক মুহূর্তের জন্য থেমে ভাবুন—একই ড্রেসিংরুম, একই জার্সি, একই আক্রমণভাগে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আর লিওনেল মেসি। শুনতেই যেন অবাস্তব লাগে। প্রায় দুই দশক ধরে ফুটবল বিশ্ব যাঁদের দ্বৈরথে ভাগ হয়ে গেছে, সেই দুজন কি আদৌ এক দলে খেলতে পারেন?
সবুজ মাঠে এই দুজন ছিলেন একে অপরের ছায়া আর প্রতিদ্বন্দ্বী। রেকর্ড ভাঙা, ব্যালন ডি’অর, গোলের হিসাব—সবখানেই তাঁদের লড়াই। কারও কাছে রোনালদো, কারও কাছে মেসি—ফুটবল ইতিহাসের ‘সেরা’ তর্কে এই দুটো নামই ঘুরে ফিরে আসে। সেই দুজনকে সতীর্থ হিসেবে কল্পনা করা এত দিন ছিল নিছক কল্পনার খেলাই।
কিন্তু হঠাৎ করেই সেই কল্পনায় আগুন জ্বালিয়ে দেয় স্পেনের প্রভাবশালী ক্রীড়া দৈনিক মুন্দো দেপোর্তিভো। পত্রিকাটির এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে নাকি রোনালদো আগ্রহী হয়ে উঠেছেন মেসির সঙ্গে ইন্টার মায়ামিতে খেলতে!
খবরটা শুনে যাঁদের চোখ বড় হয়ে গেছে, তাঁদের একটু থামতে হবে। কারণ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে ২৮ ডিসেম্বর। স্পেনে এই দিনটি অনেকটা ‘এপ্রিল ফুল’-এর মতোই—মজা, ঠাট্টা আর ভাঁওতা সংবাদে ভরা থাকে দিনটি। ফলে রোনালদো-মেসি জুটির খবরটি যে আদতে রসিকতা, সেটা বুঝতে খুব একটা কষ্ট হওয়ার কথা নয়।
তবে মজার ব্যাপার হলো, এই বানানো প্রতিবেদনের ভেতর যে যুক্তিগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো পড়ে হাসি চেপে রাখা কঠিন।
প্রথম কারণ হিসেবে বলা হয়েছে সৌদি আরবের অভিজ্ঞতার কথা। আল নাসরে খেলে রোনালদোর নাকি ‘ইগোতে’ আঘাত লেগেছে। সেখানে ফুটবল ম্যাচের চেয়ে মানুষের আগ্রহ বেশি উটের দৌড়ে! প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, রোনালদোর গোলের চেয়েও বেশি আলোচনায় থাকে কিং আবদুল আজিজ উৎসবের তিনবারের চ্যাম্পিয়ন উট ‘শাবা’। এই বাস্তবতা নাকি মানিয়ে নিতে পারছেন না পর্তুগিজ তারকা।
দ্বিতীয় কারণ আরও আজব। রোনালদোর দীর্ঘদিনের চিকিৎসক ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর রোসাদো নাকি তাঁকে সতর্ক করেছেন—সৌদি আরবের প্রখর রোদ তাঁর সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষতি করছে। নিখুঁত ‘ট্যান’ বজায় রাখতে পছন্দ করা রোনালদোর জন্য মায়ামির আবহাওয়া নাকি অনেক বেশি উপযোগী। এই পরামর্শেই তাঁর পছন্দের তালিকায় উঠে এসেছে মায়ামি।
এরপর আসে শরীরচর্চার প্রসঙ্গ। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মায়ামি হলো বডিবিল্ডারদের স্বর্গ। আর রোনালদো ভালো করেই জানেন, মায়ামি বিচে নিজের ‘সিক্স প্যাক’ প্রদর্শন করতে পারলে ভক্তসংখ্যা লাফিয়ে বাড়বে। জনপ্রিয়তা ধরে রাখার এও নাকি এক কৌশল।
সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশটি রাখা হয়েছে শেষের দিকে। মুন্দো দেপোর্তিভোর ভাষ্য অনুযায়ী, ফুটবল ছাড়ার পর রোনালদোর পরবর্তী গন্তব্য নাকি হলিউড। ‘টার্মিনেটর’ সিরিজের সপ্তম কিস্তিতে আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের সেই আইকনিক সাইবর্গ চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাবও নাকি তাঁর হাতে আছে! সে কারণে মায়ামিতে থাকা মানে প্যারামাউন্ট পিকচার্স বা এমজিএম স্টুডিওর দরজার কাছাকাছি চলে যাওয়া।
আর মেসির সঙ্গে খেলতে চাওয়ার গল্পের পেছনে দেওয়া হয়েছে সবচেয়ে ‘চালাক’ ব্যাখ্যাটি। রোনালদোর ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে থাকার যে বাসনা, সেখানে তাঁর পথে সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারেন মেসি। তাই পরিকল্পনা হলো—একই দলে খেললে মেসির বানানো সুযোগে নিজে গোল করবেন, আর ফ্রি-কিক বা পেনাল্টিগুলোও নিজেই নেবেন। তাতে গোলের হিসাবে মেসি অন্তত তাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারবেন না!
এই পুরো ব্যাখ্যা পড়ার পর আলাদা করে আর কিছু বলার থাকে না। মুন্দো দেপোর্তিভোর প্রতিবেদনটি নিছকই রসিকতা—দিনের উপলক্ষেই লেখা এক ব্যঙ্গাত্মক গল্প। বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
তবু একটুখানি কল্পনায় ডুবে যেতে ক্ষতি কী? কারণ ফুটবল এমন এক খেলা, যেখানে অসম্ভব কল্পনাগুলোই কখনো কখনো সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয়।

