আফগানিস্তান ক্রিকেটের সেই দীর্ঘদেহী পেসার, যাঁর দীর্ঘ চুলের ঝাপটা আর গতিময় বোলিং এক সময় ব্যাটসম্যানদের বুকে কাঁপন ধরাত—সেই শাপুর জাদরান আজ নিজেই জীবন-মৃত্যুর এক অসম লড়াইয়ে অবতীর্ণ। মাত্র ৩৯ বছর ছুঁইছুঁই এই বাঁহাতি পেসার বর্তমানে ভারতের নয়া দিল্লির একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। তিনি ‘হেমোফ্যাগোসাইটিক লিম্ফোহিস্টিওসাইটোসিস’ (HLH) নামক একটি অত্যন্ত বিরল এবং প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত।
কী এই বিরল রোগ HLH?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় HLH এমন একটি অবস্থা যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune System) অস্বাভাবিকভাবে অতিসক্রিয় হয়ে ওঠে। এটি নিজের শরীরের সুস্থ টিস্যুগুলোকেই ধ্বংস করতে শুরু করে। শাপুর বর্তমানে এই রোগের ‘স্টেজ ফোর’-এ রয়েছেন।
এই রোগের ফলে তাঁর শরীরের অস্থিমজ্জা (Bone marrow), লিভার এবং প্লীহা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত কয়েক মাসে তাঁর শরীরের ওজন ৯৮ কেজি থেকে কমে ৮৪ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে তিনি খুব একটা কথা বলতে পারছেন না এবং দিনের অধিকাংশ সময় ঘুমিয়ে কাটান।
যেভাবে শুরু এই কঠিন যাত্রা
শাপুরের ছোট ভাই ঘামাই জাদরান জানান, গত অক্টোবর থেকেই শাপুর অসুস্থ বোধ করছিলেন। আফগানিস্তানের চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভারতে আনা হয়। গত ১৮ জানুয়ারি তিনি দিল্লিতে পৌঁছান। দীর্ঘ এই লড়াইয়ে তাঁর সঙ্গী হয়েছেন স্ত্রী এবং আফগানিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ও সতীর্থ আসগর আফগান।
শাপুরের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বড় ভূমিকা রেখেছেন দেশটির তারকা ক্রিকেটার রশিদ খান এবং আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (এসিবি) চেয়ারম্যান মিরওয়াইস আশরাফ। বিসিসিআই সচিব জয় শাহর সহযোগিতায় দ্রুততম সময়ে শাহপুরের ভিসার ব্যবস্থা করা হয়।
ক্রিকেট বিশ্বের সংহতি ও দোয়া
বিপদে সতীর্থের পাশে দাঁড়াতে কার্পণ্য করেনি ক্রিকেট বিশ্ব। দিল্লির হাসপাতালে শাপুরকে দেখতে গিয়েছেন এসিবি চেয়ারম্যান মিরওয়াইস আশরাফ। চলতি আইপিএল চলাকালীন মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের আফগান স্পিনার আল্লাহ গজনফর হাসপাতালে গিয়ে শাপুরের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন। এছাড়া নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন রশিদ খান এবং ওয়ানডে অধিনায়ক হাশমতুল্লাহ শাহিদি।
শুধুমাত্র সতীর্থরাই নন, পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদিও শাপুরের ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে সমবেদনা জানিয়েছেন। জানা গেছে, সোমবার আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়েরও শাপুরকে কল করার কথা রয়েছে।
আশার আলো: স্টেরয়েডে সাড়া দিচ্ছেন শাপুর
ঘামাই জাদরান জানান, সম্প্রতি দেওয়া উচ্চমাত্রার স্টেরয়েডগুলোতে শাপুর কিছুটা সাড়া দিচ্ছেন। চিকিৎসকদের দেওয়া এই নতুন ওষুধগুলো কাজ করায় পরিবার নতুন করে আশার আলো দেখছে। চার ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে শাপুরই সবার বড় এবং পুরো পরিবারের প্রধান অভিভাবক।
আফগানিস্তানের হয়ে ৮০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ (৪৪টি ওয়ানডে ও ৩৬টি টি-টোয়েন্টি) খেলা শাপুর জাদরান আফগান ক্রিকেটের উত্থানের অন্যতম সাক্ষী। ২০১৫ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে চার মেরে দলকে জেতানোর পর তাঁর সেই বুনো দৌড় আজও ভক্তদের মনে অম্লান। সেই লড়াকু যোদ্ধার দ্রুত সুস্থতার জন্য এখন ক্রিকেট বিশ্বজুড়ে চলছে প্রার্থনা।

