ইউরোপীয় ফুটবলের ইতিহাসে এমন ‘পাগল করা’ রাত খুব কমই এসেছে। একদিকে লিসবনে গোলরক্ষকের অবিশ্বাস্য গোলে রিয়াল মাদ্রিদের দর্পচূর্ণ, অন্যদিকে ইংলিশ ক্লাবগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্যে লণ্ডভণ্ড ইউরোপীয় ফুটবল। উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের অষ্টম ম্যাচডে শেষে ফুটবল বিশ্ব দেখল এক মহাপ্রলয়, যেখানে রেকর্ডবই ওলটপালট হয়েছে প্রতি মিনিটে।
লিসবন থেকে লন্ডন, কিংবা প্যারিস থেকে মিউনিখ—ফুটবল অনুরাগীরা স্রেফ স্তব্ধ হয়ে দেখল ট্রুবিনের মিরাকল, এমবাপ্পের গোলবর্ষণ আর গার্দিওলার মাইলফলক ছোঁয়ার রাত।
লিসবনের মহাকাব্য: যখন গোলরক্ষকই ত্রাতা
লিসবনের এস্তাদিও দা লুজে যা ঘটল, তা কোনো রূপকথাকেও হার মানাবে। জোসে মরিনহোর বেনফিকার বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদ ৪-২ গোলে হেরে সরাসরি শেষ ১৬-র দৌড় থেকে ছিটকে গেল। কিন্তু নাটকের শেষ অঙ্ক তখনও বাকি ছিল। ম্যাচের শেষ সেকেন্ডে কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে বুলেট গতির হেডে গোল করলেন বেনফিকা গোলরক্ষক আনাতোলি ট্রুবিন!
মরিনহোর ক্যারিয়ারে এটিই রিয়ালের বিপক্ষে প্রথম জয়। অন্যদিকে, ট্রুবিন হয়ে গেলেন চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে গোল করা মাত্র পঞ্চম গোলরক্ষক। রিয়ালের এই পতনে মরিনহোর বেনফিকা ২৪তম স্থানে উঠে এসে প্লে-অফ নিশ্চিত করল, আর রিয়ালকে পড়তে হলো অনাকাঙ্ক্ষিত লজ্জায়।
ইংলিশ জায়ান্টদের ‘হুংকার’
এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বে ইংলিশ ক্লাবগুলোর দাপট ছিল চোখের পড়ার মতো। শীর্ষ আটটি দলের মধ্যে ৫টিই ইংল্যান্ডের। আর্সেনাল, লিভারপুল, চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটি এবং টটেনহ্যাম হটস্পার—সবাই সরাসরি শেষ ১৬-তে নিজেদের নাম লিখিয়েছে।
অন্যদিকে, প্যারিসের মাঠে পিএসজির বিপক্ষে ১-১ ড্র করে বীরত্বগাথা লিখেছে নিউক্যাসল ইউনাইটেড। অর্থাৎ, ইউরোপীয় ফুটবলের রিমোট কন্ট্রোল এখন যেন পুরোপুরি ব্রিটিশদের হাতে।
এমবাপ্পে ও লেভানডোভস্কির রেকর্ডের লড়াই
এই ঐতিহাসিক রাতে এমবাপ্পে ও লেভানডোভস্কি দুজনেই ফুটবল ইতিহাসের নতুন পাতায় নাম লিখিয়েছেন। কোপেনহেগেনের বিপক্ষে গোল করে রবার্ট লেভানডোভস্কি লিওনেল মেসির একটি অনন্য রেকর্ড স্পর্শ করেছেন। এখন মেসির মতো তিনিও ইউরোপের ৪০টি ভিন্ন ক্লাবের বিপক্ষে গোল করার মালিক।
অন্যদিকে, রিয়ালের হারের রাতেও উজ্জ্বল ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। জোড়া গোল করে এই মৌসুমে নিজের গোল সংখ্যাকে নিয়ে গেছেন ৩৬-এ, যা ইউরোপের শীর্ষ ৫ লিগের যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি। চ্যাম্পিয়নস লিগের এক লিগ পর্বে ১৩ গোল করে তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর (১১ গোল) রেকর্ডটিও চুরমার করে দিয়েছেন।
এক নজরে রোমাঞ্চকর রাতের পরিসংখ্যান
| ক্যাটাগরি | তথ্য ও রেকর্ড |
| মোট গোল | ৬১ (ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ) |
| গার্দিওলার মাইলফলক | ৪০০ জয় (মাত্র ৫৬৯ ম্যাচে) |
| ভ্যান ডাইকের জাদু | ১ ম্যাচে ৩ অ্যাসিস্ট (প্রথম ডিফেন্ডার হিসেবে) |
| মোহাম্মদ সালাহ | ক্যারিয়ারের ২৫১তম গোল (প্রথম ফ্রি-কিক গোল) |
| বোডো/গ্লিমট | ২৯ বছর পর নরওয়ের কোনো ক্লাব নকআউটে |
গার্দিওলার ‘৪০০’ ও ফন ডাইকের রাজকীয় রূপ
ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ৪০০তম জয়ের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন পেপ গার্দিওলা। মাত্র ৫৬৯ ম্যাচে এই উচ্চতায় পৌঁছে তিনি ইংলিশ ফুটবলে দ্রুততম সময়ে ৪০০ জয়ের রেকর্ডটি নিজের করে নিলেন।
অন্যদিকে, লিভারপুলের ৬-০ গোলের জয়ে অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক প্রথম সেন্টার ব্যাক হিসেবে এক ম্যাচে ৩টি অ্যাসিস্ট করার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েন। কারাবাখের বিপক্ষে এই ম্যাচে মোহাম্মদ সালাহও সামিল হয়েছেন তাঁর লিভারপুল ক্যারিয়ারের প্রথম সরাসরি ফ্রি-কিক গোল দিয়ে।
আন্ডারডগদের উত্থান: বোডো/গ্লিমটের চমক
রাতের অন্যতম বড় চমক ছিল নরওয়ের ক্লাব বোডো/গ্লিমট। অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে তাদের মাঠেই ২-১ গোলে হারিয়ে চমকে দিয়েছে তারা। ১৯৯৬-৯৭ সালের পর নরওয়ের দ্বিতীয় কোনো ক্লাব হিসেবে তারা নকআউট পর্বে জায়গা করে নিল। এর ফলে অ্যাটলেটিকোর ঘরের মাঠে টানা ১৮ ম্যাচের অপরাজিত যাত্রার অবসান ঘটল।
রেকর্ড ভাঙা-গড়ার এমন নাটকীয়তা চ্যাম্পিয়নস লিগকে আবারও প্রমাণ করল কেন এটি বিশ্বের সেরা ক্লাব টুর্নামেন্ট।

