লিভারপুলের তারকা ফ্লোরিয়ান ভির্টজলিভারপুলের জার্সিতে ফ্লোরিয়ান ভির্টজের গোলের উল্লাস। ছবি: রয়টার্স

অ্যানফিল্ডে আজ বৃহস্পতিবার লিডস ইউনাইটেডের মুখোমুখি হচ্ছে লিভারপুল। ক্যালেন্ডারে সময়টা খুব বেশি না বদলালেও বাস্তবতা বদলে গেছে চোখে পড়ার মতো। গত ডিসেম্বরেই এই লিডসের মাঠ এল্যান্ড রোডে খেলতে গিয়ে যে দলটিকে প্রায় ভেঙে পড়া মনে হয়েছিল, সেই লিভারপুলই এখন আবার আত্মবিশ্বাসের গল্প শোনাচ্ছে।

৬ ডিসেম্বরের সেই ম্যাচটা ছিল অলরেডদের জন্য একরকম সতর্ক সংকেত। ৩–৩ ড্রয়ের পর লিভারপুলের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল সর্বত্র। কোচ আর্নে স্লটের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যেই অসন্তোষ জানিয়েছিলেন মোহাম্মদ সালাহ। বেঞ্চে বসানো, রোটেশন আর রক্ষণভাগের বারবার ভুল—সব মিলিয়ে লিভারপুল যেন দিশাহারা এক দল। ইব্রাহিমা কোনাতেদের ভুলে দুবার এগিয়েও জয় ধরে রাখতে পারেনি তারা।

সেই ম্যাচের পরই প্রিমিয়ার লিগের পয়েন্ট টেবিলে লিভারপুল নেমে গিয়েছিল দশে। আগের দশ ম্যাচে মাত্র দুটি জয়। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মৌসুমেই স্লটের ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হয়ে গিয়েছিল জল্পনা। শিরোপা জয়ের প্রত্যাশা তো দূরের কথা, কোচের চেয়ারটাই তখন নড়বড়ে।

কিন্তু ফুটবল বড়ই বদলানো খেলাধুলা। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দৃশ্যপট পুরোপুরি পাল্টে গেছে। ব্রাইটন, টটেনহাম ও উলভসের বিপক্ষে টানা তিন জয়ে লিভারপুল এখন চারের মধ্যে। সালাহ ও কোচের মধ্যকার দূরত্বও আর আলোচনায় নেই। আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে যাওয়ার আগে সালাহকে হাসিমুখে বিদায় দিয়েছেন স্লট—যা অনেক কিছুই বলে দেয়।

তবু প্রশ্নটা থেকেই যায়—এই জয়ের ধারাটা কি আসল ছন্দে ফেরার প্রমাণ, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে পারফরম্যান্সের ফাঁকফোকর?

নতুন বছরের শুরুতে অ্যানফিল্ডে আশার আলো দেখা যাচ্ছে ঠিকই। গ্রীষ্মের দলবদলে আসা ফুটবলাররা ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছেন। তবে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে আলেক্সান্ডার ইসাকের চোট। ক্লাবের সবচেয়ে দামি এই ফরোয়ার্ড মার্চ পর্যন্ত মাঠের বাইরে। নিজের দ্বিতীয় গোলটি করার সময়ই গুরুতর চোটে পড়েছেন তিনি। মার্সিসাইডে তাঁর প্রথম মৌসুমটা আপাতত ব্যর্থ প্রকল্প হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

ইসাক না থাকলেও লিভারপুলের জন্য বড় প্রাপ্তি হয়ে উঠেছেন উগো একিতিকে। অনেকের চোখে এখন তিনি ইসাকের চেয়েও কার্যকর। ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে আসা এই ফরাসি ফরোয়ার্ড যে এত দ্রুত মানিয়ে নেবেন, তা হয়তো রিক্রুটমেন্ট টিমও পুরোপুরি ভাবেনি।

১৮ ম্যাচ শেষে পেনাল্টি ছাড়া লিগে তাঁর গোল সংখ্যা আট—আর্লিং হলান্ডের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। শেষ চার ম্যাচে পাঁচ গোল করে নিজেকে স্লটের আক্রমণভাগের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে ফেলেছেন ২৩ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। উলভসের বিপক্ষে ফ্লোরিয়ান ভির্টৎসকে দিয়ে করানো তাঁর অ্যাসিস্ট ছিল ক্লাসিক উদাহরণ।

সেই ম্যাচেই লিভারপুলের জার্সিতে প্রথম গোল পেয়েছেন ভির্টৎস। ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডের এই জার্মান তারকার উদ্‌যাপনে স্পষ্ট ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার চাপমুক্তি। পুরো ম্যাচজুড়ে উলভসের রক্ষণকে বারবার বিপাকে ফেলেছেন তিনি। ক্লাব কিংবদন্তি জন অলড্রিজ তাঁর চলাফেরায় পিটার বিয়ার্ডসলির ছায়া দেখছেন। স্লট অবশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ভির্টৎস শুরু থেকেই ভালো খেলছিলেন—এখন শারীরিকভাবে আরও শক্ত হওয়ায় ইংলিশ ফুটবলের ধকল সামলাতে পারছেন।

জেরেমি ফ্রিমপংয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। চোটের কারণে মৌসুমের বড় অংশ মিস করলেও ফেরার পরই প্রভাব ফেলেছেন এই ডাচ উইংব্যাক। মাত্র ১২০ মিনিট খেলে দুটি অ্যাসিস্ট করে দেখিয়ে দিয়েছেন কেন বুন্দেসলিগায় তিনি এত আলোচিত ছিলেন। রায়ান গ্রাভেনবার্চের গোলটিতে তাঁর ভূমিকা দেখে স্লট বলেছিলেন, “গতিই ওর সবচেয়ে বড় শক্তি।”

তবে সমস্যাহীন নয় এই লিভারপুল। সেট-পিস এখন বড় দুর্বলতা। লিগে হজম করা ২৬ গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে কর্নার, থ্রো-ইন বা ফ্রি-কিক থেকে—প্রায় ৪৬ শতাংশ। গত মৌসুমে যারা ডেড-বল থেকে একটিও গোল খায়নি, তাদের এই অবনমন ভাবাচ্ছে।

ভার্জিল ফন ডাইক জানাচ্ছেন, আকাশে বল দখলে তারা খুব একটা পিছিয়ে নেই। সমস্যা হচ্ছে বিপদজনক মুহূর্তে বল ক্লিয়ার করতে না পারা। এর দায় গিয়ে পড়েছে সেট-পিস কোচ অ্যারন ব্রিগসের ওপর—যাঁকে মঙ্গলবার বরখাস্ত করেছে ক্লাব। তবে শুধু কোচ নয়, মাঝমাঠের ভারসাম্য ও মানসিক দৃঢ়তাও প্রশ্নের মুখে। ম্যাক অ্যালিস্টার বা গ্রাভেনবার্চরা সোবোসলাইয়ের মতো প্রেসিং দিতে পারছেন না। ফলে বলের দখল থাকলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হাতে রাখতে পারছে না লিভারপুল।

বাস্তবতা হলো—লিভারপুল জিতছে, কিন্তু সহজে নয়। ইন্টার মিলানের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগে জয় এসেছে ভাগ্যের সহায়তায়, ব্রাইটনের বিপক্ষে ম্যাচকেও ‘লাকি’ বলেছেন স্লট নিজেই। টটেনহাম কিংবা উলভস—কোনো ম্যাচেই সেই পুরোনো দাপট পুরোপুরি দেখা যায়নি।

আজ লিডসের বিপক্ষে আবারও কঠিন পরীক্ষা। সেট-পিসে লিডস বেশ কার্যকর দল। স্লট উন্নতির কথা বলছেন, কিন্তু সেই উন্নতি কতটা বাস্তব—তা বোঝা যাবে অ্যানফিল্ডের নব্বই মিনিটেই। জয় পেলেও লিভারপুল এখনো তাদের সেরা রূপে ফেরেনি। তাই আজকের ম্যাচ শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়, বরং হারানো আত্মবিশ্বাস ও গৌরব ফিরে পাওয়ার আরেকটি বড় সুযোগ।

এই মুহূর্তে সমর্থকদের প্রাপ্তি একটাই—মৌসুমের শুরুটা যতই অস্থির হোক, আর্নে স্লটের লিভারপুলের ‘রোলার কোস্টার’ যাত্রা আপাতত আবার ওপরে উঠছে।