Sadio Mane Senegal AFCON 2025 Cricfoot24সাদিও মানেকে ঘিরে উল্লাস সেনেগালের। ছবি: এএফপি

আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনাল সাধারণত শেষ হয় উল্লাসে, ট্রফি উঁচিয়ে ধরা মুহূর্তে। কিন্তু মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠিত এবারের ফাইনাল শেষ হয়েছে ভিন্ন অনুভূতিতে—উত্তেজনা, অস্বস্তি আর আফ্রিকান ফুটবলের ভাবমূর্তি নিয়ে গভীর প্রশ্ন রেখে।

সব নাটক পেরিয়ে অতিরিক্ত সময়ে গোল করে শিরোপা জিতেছে সেনেগাল। এটি আফ্রিকার সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতায় তাদের দ্বিতীয় শিরোপা, পাঁচ বছরের মধ্যে আরেকটি সাফল্য। তবু ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে শিরোপা নয়, বরং শিরোপাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা।

৯০ মিনিটের নির্ধারিত সময় গোলশূন্য থাকার পর যোগ করা সময়েই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। ৯৮তম মিনিটে ভিএআর পরামর্শে রেফারি জ্যাঁ জ্যাকস এনদালা মরক্কোর পক্ষে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন। ব্রাহিম দিয়াজের সঙ্গে সেনেগাল ডিফেন্ডার এল হাজি মালিক দিউফের সংঘর্ষকে ফাউল হিসেবে গণ্য করা হয়।

এই সিদ্ধান্ত আসে এমন এক মুহূর্তে, যখন এর ঠিক আগে সেনেগালের একটি গোল বাতিল হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছিলেন কোচ পাপে থিয়াও। ক্রিস্টাল প্যালেসের ফরোয়ার্ড ইসমাইলা সার কাছ থেকে বল জালে পাঠালেও বিল্ড-আপে ফাউলের কারণে সেটি বাতিল করেন রেফারি।

পেনাল্টির বাঁশি বাজতেই থিয়াওয়ের ক্ষোভ চরমে পৌঁছায়। তিনি খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন। কয়েকজন খেলোয়াড় টানেলের দিকে হাঁটতে শুরু করেন। মাঠে নেমে আসে অচলাবস্থা, খেলা বন্ধ হয়ে যায়। স্টেডিয়ামে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, দর্শকদের একটি অংশ মাঠে ঢোকার চেষ্টাও করে।

এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেও ব্যতিক্রম ছিলেন সেনেগালের সবচেয়ে বড় তারকা সাদিও মানে। সাবেক লিভারপুল ফরোয়ার্ড মাঠে থেকে যান, সতীর্থদের খেলায় ফেরার আহ্বান জানান। পরে ম্যাচ শেষে তিনি নিজেই বলবেন—পেনাল্টির সিদ্ধান্তে খেলা ছেড়ে দেওয়া হলে সেটি আফ্রিকান ফুটবলের জন্য সবচেয়ে খারাপ দৃষ্টান্ত হতো।

প্রায় ১৭ মিনিট বন্ধ থাকার পর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে সেনেগালের খেলোয়াড়েরা মাঠে ফেরেন। পেনাল্টি নিতে এগিয়ে যান মরক্কোর ভরসার নাম ব্রাহিম দিয়াজ। টুর্নামেন্টে পাঁচ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া এই ফরোয়ার্ড ঝুঁকিপূর্ণ ‘পানেনকা’ শট নেন। কিন্তু সেটি সহজেই আটকে দেন সেনেগাল গোলকিপার এদুয়ার্দো মেন্দি। শট নেওয়ার পরপরই পূর্ণ সময়ের বাঁশি বাজান রেফারি।

মরক্কোর জন্য তখন সেটি ছিল সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার মুহূর্ত। ১৯৭৬ সালের পর প্রথম আফ্রিকা কাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায় তাদের। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

অতিরিক্ত সময়ে গোল, কিন্তু শেষ হয়নি বিতর্ক

অতিরিক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটে ভিয়ারিয়ালের মিডফিল্ডার পাপে গেয়ের পা থেকে আসে ফাইনালের একমাত্র গোল। সেই গোলেই নিশ্চিত হয় সেনেগালের শিরোপা। ২০২১ সালের পর আবারও আফ্রিকা সেরা হয় ‘লায়ন্স অব তেরাঙ্গা’।

কিন্তু ম্যাচ শেষে উদ্‌যাপনের আবহ দ্রুতই ঢেকে যায় বিতর্কে। মরক্কোর কোচ ওয়ালিদ রেগরাগুই সংবাদ সম্মেলনে সেনেগালের মাঠ ছাড়ার ঘটনাকে আখ্যা দেন ‘লজ্জাজনক’ বলে। তাঁর ভাষায়, এটি আফ্রিকার জন্য সম্মানজনক কিছু নয়।

অন্যদিকে সেনেগাল কোচ পাপে থিয়াও সংবাদ সম্মেলনে হাজিরই হতে পারেননি। সংবাদ সম্মেলন কক্ষে হট্টগোলের কারণে সেটি বাতিল করা হয়। পরে বিইন স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন, মুহূর্তের উত্তেজনায় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ফুটবলের কাছে ক্ষমা চেয়ে থিয়াও বলেন, রেফারির ভুল থাকলেও মাঠ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হয়নি।

পুরো ঘটনায় সেনেগালের ভেতর থেকে সবচেয়ে সংযত কণ্ঠ শোনা যায় সাদিও মানের। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ফুটবল পুরো বিশ্ব দেখছে, তাই মাঠে খেলোয়াড়দের আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, পেনাল্টির কারণে খেলা বন্ধ করে দেওয়া হলে তা আফ্রিকান ফুটবলের জন্য ভয়ংকর দৃষ্টান্ত হতো।

“আমি এমন ঘটনার চেয়ে হার মেনে নেওয়াকেও ভালো মনে করি,” বলেন মানে।

গোলকিপার এদুয়ার্দো মেন্দিও গর্বের সঙ্গে বলেন, দল হিসেবে তারা মাঠে ফিরেছে এবং দল হিসেবেই জিতেছে। ম্যাচজয়ী পাপে গেয়ে জানান, পেনাল্টির আগের ঘটনাগুলোতে তারা অন্যায় বোধ করেছিলেন, তবে মানের কথায় আবার মনোযোগ ফিরে পান।

এই ফাইনালের উত্তেজনার পেছনে ম্যাচের আগের দিনগুলোর ঘটনাও বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ফাইনালের আগে সেনেগাল ফুটবল ফেডারেশন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। রাবাতে পৌঁছানোর সময় দলবহরে ভিড়, পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব, সমর্থকদের জন্য কম টিকিট বরাদ্দ এবং অনুশীলনের সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগও তুলেছিল তারা।

এসব জমে থাকা অসন্তোষই শেষ পর্যন্ত মাঠের ঘটনায় প্রতিফলিত হয়েছে—এমনটাই মত অনেক পর্যবেক্ষকের।

মরক্কো আয়োজনের দিক থেকে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। অবকাঠামো, স্টেডিয়াম ও যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোসহ অনেকেই ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তবু চার বছর পর বিশ্বকাপের সহ–আয়োজক দেশ হিসেবে মরক্কোর প্রস্তুতির আলোচনায় এই ফাইনালের বিশৃঙ্খল দৃশ্য বড় দাগ কেটে থাকবে।

সেনেগাল ইতিহাসে যুক্ত করল আরেকটি শিরোপা। কিন্তু এই ফাইনাল মনে থাকবে মূলত একটি প্রশ্ন রেখে—ফুটবলের জয় কি সত্যিই মাঠের খেলায় নির্ধারিত হলো, নাকি সেই জয়ের ছায়ায় রয়ে গেল এমন কিছু দৃশ্য, যা আফ্রিকান ফুটবল ভুলে যেতে চাইবে দ্রুত?