হ্যানয়ের হ্যাং ডে স্টেডিয়ামে ভিয়েতনামের ফুটবলারদের আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা।রক্ষণ সামলাতে হয়েছে হামজা-শামিতদেরও। ছবি: বাফুফে

সিঙ্গাপুর ম্যাচের আগে নিজেদের ঝালিয়ে নিতে হ্যানয়ের হ্যাং ডে স্টেডিয়ামে ভিয়েতনামের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে প্রস্তুতির চেয়ে একরাশ দুশ্চিন্তাই সঙ্গী হলো হাভিয়ের কাবরেরার। র‍্যাঙ্কিংয়ে ৭৮ ধাপ এগিয়ে থাকা ভিয়েতনামের কাছে ৩–০ গোলের হারটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং মাঠের ফুটবলে শক্তির বিশাল ব্যবধানেরই প্রতিফলন। প্রথমার্ধের মাত্র ৩৮ মিনিটের ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের এই হারের নেপথ্য কারণগুলো বিশ্লেষণ করা যাক।

১. রক্ষণের সমন্বয়হীনতা ও আত্মঘাতী ভুল

ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশের রক্ষণভাগ ছিল ছন্নছাড়া। বিশেষ করে সেট-পিস সামলাতে কাজী তারিক ও শাকিল আহাদরা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। অষ্টম মিনিটে কর্ণার ক্লিয়ার করতে গিয়ে গোলরক্ষক মেহেদী হাসান শ্রাবণ বলের নাগাল পাননি, আর সেই সুযোগে তরুণ ডিফেন্ডার জায়োন আহমেদের আত্মঘাতী গোলটি বাংলাদেশকে মানসিকভাবে ছিটকে দেয়। তারিক কাজীর ভুল পাস এবং রক্ষণভাগের পজিশনিংয়ের দুর্বলতা ভিয়েতনামকে বারবার পেনাল্টি বক্সের ভেতর জায়গা করে দিয়েছে।

২. মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের ‘বিবর্ণ’ পারফরম্যান্স

হামজা চৌধুরী ও শমিত সোম মাঝমাঠ থেকে বলের জোগান দেওয়ার চেষ্টা করলেও আক্রমণভাগে ফাহামিদুল ইসলাম এবং ফয়সাল আহমেদ ফাহিমরা ছিলেন একেবারেই নিষ্প্রভ। ভিয়েতনামের আঁটসাঁট রক্ষণের সামনে বাংলাদেশের ফরোয়ার্ডরা কোনো কার্যকর সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। ২০ মিনিটে ফাহিমের একটি শট ছাড়া পুরো ম্যাচে ভিয়েতনাম গোলরক্ষককে তেমন কোনো পরীক্ষাই দিতে হয়নি। বিশেষ করে বল পজেশন ধরে রাখা এবং প্রতি-আক্রমণে গতি সঞ্চার করার ক্ষেত্রে কাবরেরার শিষ্যরা দশে শূন্য পেয়েছেন।

৩. প্রবাসীদের ওপর অতি-নির্ভরতা?

এই ম্যাচে পাঁচজন প্রবাসী ফুটবলারকে নিয়ে সেরা একাদশ সাজিয়েছিলেন কোচ। হামজা চৌধুরী দলের প্রাণভোমরা হয়ে উঠলেও একক নৈপুণ্যে ম্যাচ জেতানো যে অসম্ভব, তা আজ প্রমাণিত। হামজার ৮৬ মিনিটের সেই ব্যাক-হিল প্রচেষ্টাটি ছিল ম্যাচে বাংলাদেশের সেরা মুহূর্ত, কিন্তু তা গোলের জন্য যথেষ্ট ছিল না। প্রবাসীদের ব্যক্তিগত দক্ষতা থাকলেও স্থানীয় খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাদের রসায়ন এখনো শতভাগ জমে ওঠেনি, যা বড় দলের বিপক্ষে ভুগিয়েছে বাংলাদেশকে।

৪. গোলরক্ষক নির্বাচনে জুয়া

নিয়মিত গোলরক্ষক মিতুল মারমাকে বসিয়ে মেহেদী হাসান শ্রাবণকে দায়িত্ব দেওয়াটা কতটা যৌক্তিক ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। প্রথম গোলটি হজমের ক্ষেত্রে শ্রাবণের ভুল টাইমিং দায়ী ছিল। যদিও পরে তিনি বেশ কিছু ভালো সেভ করেছেন, তবে প্রথম ৩৮ মিনিটে তিন গোল হজম করাটা দলের আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে চুরমার করে দেয়।

আরও পড়ুন: হামজাদের জন্য কঠিন পরীক্ষার নাম ভিয়েতনাম

৫. কৌশলগত ব্যর্থতা ও দেরিতে পরিবর্তন

দ্বিতীয় অর্ধে শেখ মোরছালিন ও শাহরিয়ার ইমনকে নামিয়ে আক্রমণে গতি ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন কাবরেরা। দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ কোনো গোল হজম না করলেও, গোল শোধ করার মতো মরিয়া ভাবটা উধাও ছিল। ভিয়েতনাম যখন বল নিয়ন্ত্রণে রেখে সময় পার করছিল, বাংলাদেশ তখনো রক্ষণাত্মক খোলস ছেড়ে বের হতে পারেনি।

এবং…

সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে এই হার বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ‘ওয়েক-আপ কল’। র‍্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধান মাঠের ফুটবলে কতটা প্রকট হতে পারে, তা হাড়হাড়ে টের পেল লাল-সবুজরা। ৩১ মার্চ সিঙ্গাপুরের মাঠে নামার আগে রক্ষণভাগের এই বিশাল ফুটো এবং ফরোয়ার্ডদের গোল খরা কাটাতে না পারলে সিঙ্গাপুর থেকেও পয়েন্ট নিয়ে ফেরা কঠিন হবে।