ঠিক ১০ বছর আগে আজকের এই দিনে (২ মে ২০১৬) ফুটবল বিশ্ব সাক্ষী হয়েছিল এক অবিশ্বাস্য মহাবিস্ময়ের। লেস্টার সিটির রূপকথার সেই প্রিমিয়ার লিগ জয়ের ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ। টটেনহ্যাম ও চেলসির ২-২ ড্রয়ের পর যখন লেস্টারের শিরোপা নিশ্চিত হয়, তখন জেমি ভার্ডির বাড়ির সেই বিখ্যাত পার্টিতে যোগ দিতে গিয়ে যে বিচিত্র ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন মার্ক অলব্রাইটন ও বেন চিলওয়েল, তা আজও শিহরণ জাগায় ফুটবলপ্রেমীদের মনে।
পুলিশি পাহারায় পার্টিতে যোগদান
২০১৬ সালের সেই ঐতিহাসিক রাতে লেস্টার সিটির শিরোপা নিশ্চিত হওয়ার পর হাজার হাজার ভক্ত জেমি ভার্ডির বাড়ির সামনে ভিড় করেছিলেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, অলব্রাইটন ও তরুণ বেন চিলওয়েলকে নিরাপত্তার খাতিরে থানায় আশ্রয় নিতে হয়েছিল!
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অলব্রাইটন বিবিসিকে বলেন, “আমি আমার বাবা-মাকে বলেছিলাম আমাকে ভার্ডির বাড়িতে নামিয়ে দিতে। কিন্তু তার বাড়ির গেটের সামনে এত ভক্ত ছিল যে পুলিশ আমাকে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে দেখি বেন চিলওয়েল আগে থেকেই বসে আছে! আমরা দুজন পুলিশের গাড়ির পেছনে বসে ভার্ডির বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম, আর ভক্তরা গাড়ির কাঁচ চাপড়াচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমরা কোনো বড় সেলিব্রেটি।”
আরও পড়ুন: রূপকথা থেকে দুঃস্বপ্নের গহ্বরে: হামজার লেস্টার সিটির ট্র্যাজিক পতন
৫০০০-১ এর সেই অসম্ভব জয়
লেস্টার সিটির এই জয়কে ক্রীড়া ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ‘আন্ডারডগ’ স্টোরি বা ‘৫০০০-১’ এর রূপকথা বলা হয়। কারণ আগের মৌসুমে রেলিগেশন থেকে কোনোমতে বেঁচে ফেরা একটি দল প্রিমিয়ার লিগ জিতবে—এমন বাজি ধরার লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। বুকমেকাররা লেস্টারকে শিরোপার দৌড়ে একেবারে বাতিলের খাতায় রেখেছিল।
কিন্তু ক্লদিও রানিয়েরির সেই জাদুকরী ছোঁয়ায় জেমি ভার্ডি, রিয়াদ মাহরেজ, এন’গোলো কান্তে আর ক্যাসপার স্মাইকেলরা ফুটবল ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন। অলব্রাইটন বলেন, “১০ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এমন কোনো দিন যায়নি যেদিন কেউ এই অর্জনের কথা মনে করিয়ে দেয়নি। এটিই প্রমাণ করে আমাদের অর্জন কতটা বিশাল ছিল।”
সাফল্যের আনন্দ বনাম বর্তমানের বিষাদ
শিরোপা জয়ের দশ বছর পূর্তিতে যখন গোটা লেস্টার শহর উৎসবে মাতোয়ারা হওয়ার কথা, তখন এক বিষণ্ণ ছায়া ঘিরে ধরেছে কিং পাওয়ার স্টেডিয়ামকে। টানা দুই মৌসুমে অবনমনের শিকার হয়ে লেস্টার সিটি এখন তাদের ইতিহাসের দ্বিতীয়বারের মতো ইংলিশ ফুটবলের তৃতীয় টায়ার বা ‘লিগ ওয়ান’-এ খেলার অপেক্ষায়।
সাবেক অধিনায়ক ওয়েস মর্গান বলেন, “ক্লাবের বর্তমান অবস্থা দেখে আমি ব্যথিত ও লজ্জিত। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমাদের সেই বিশাল অর্জন ম্লান হয়ে যাবে। যাই ঘটুক না কেন, সেই রূপকথা আমাদের এবং ভক্তদের মনে আজীবন অম্লান থাকবে।”
আরও পড়ুন: হামজার লেস্টার সিটি: ৮ হাজার কোটির ঋণ, ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখা ক্লাব!
যে নক্ষত্ররা গড়েছিলেন সেই ইতিহাস
লেস্টারের সেই দলে যেমন ছিলেন রানিয়েরির মতো অভিজ্ঞ কোচ, তেমনি ছিলেন জফরা আর্চারের মতো তরুণ বা কান্তের মতো নিরলস পরিশ্রমি মিডফিল্ডার। ক্রিশ্চিয়ান ফুচস, রবার্ট হুট এবং ড্যানি ড্রিঙ্কওয়াটারদের মতো খেলোয়াড়রা নিজেদের ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করেছিলেন সেই মৌসুমে।
রানিয়েরির ‘ডিলি ডিং, ডিলি ডং’ ক্যাচফ্রেজ বা ক্লিন শিট রাখলে পিৎজা খাওয়ানোর সেই মজাদার স্মৃতিগুলো আজও ভক্তদের মুখে মুখে ফেরে। লেস্টার সিটির সেই জয় শুধু একটি ক্লাবের জয় ছিল না, এটি ছিল ছোট দলগুলোর বড় স্বপ্ন দেখার এক অনন্য সাহস।

