মৌসুমে ৪১টি গোল করা কোনো ফুটবলার যখন ঘরের মাঠেই দুয়োর শিকার হন, তখন বুঝতে হবে মাঠের ভেতরের চেয়ে মাঠের বাইরের জটিলতাই আজ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে গতকাল রাতে ওভিয়েদোর বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদ ২-০ গোলে জিতলেও সব আলো কেড়ে নিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে—তবে পারফরম্যান্স দিয়ে নয়, বরং বিস্ফোরক এক অভিযোগে। কোচ আলভারো আরবেলোয়া এবং এমবাপ্পের মধ্যকার শীতল যুদ্ধের যে প্রতিচ্ছবি মিক্সড জোনে ফুটে উঠেছে, তা রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিংরুমের অরাজকতাকেই নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিল।
সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর বিষাক্ত সন্ধ্যা
ম্যাচের ৬৯ মিনিটে যখন এমবাপ্পে মাঠে নামছিলেন, তখন গ্যালারিতে উৎসবের বদলে ছিল তীব্র শিস আর দুয়োধ্বনি।
রিয়াল সমর্থকেরা এমবাপ্পের নিবেদন নিয়ে ক্ষুব্ধ। গত সপ্তাহে এল ক্লাসিকোতে ইনজুরির কারণে না খেলা এবং সেই ফাঁকে সারদিনিয়ায় তাঁর ছুটি কাটানোর ছবি রিয়াল ভক্তদের জখমে নুনের ছিটা দিয়েছে। বিশেষ করে বার্সেলোনা সেই ম্যাচ জিতে লিগ শিরোপা নিশ্চিত করায় ক্ষোভ এখন আকাশচুম্বী। অনলাইনে ‘এমবাপ্পে আউট’ পিটিশনে যখন কোটি মানুষ স্বাক্ষর করছে, তখন মাঠেও তার প্রতিফলন ছিল স্পষ্ট। যদিও এমবাপ্পে বেশ নির্বিকারভাবেই বললেন, “দুয়ো…এটাই জীবন। মানুষ ক্ষুব্ধ থাকলে তাদের মতামত পাল্টানো কঠিন। আমার মতো বিখ্যাত খেলোয়াড়ের জীবনে এটা মেনে নিতেই হবে।”
আরও ড়ুন:
রিয়াল মাদ্রিদে এমবাপ্পের বিদায়ের সুর: গলার কাঁটা ৪০০ মিলিয়ন!
“চতুর্থ পছন্দের স্ট্রাইকার” এবং কোচ-খেলোয়াড় দ্বন্দ্ব
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের সামনে এসে এমবাপ্পে বোমা ফাটান তাঁর একাদশে না থাকা নিয়ে। ২৭ বছর বয়সী এই ফরাসি তারকার দাবি, কোচ আরবেলোয়া তাঁকে সরাসরি জানিয়েছেন যে তিনি এখন দলের চতুর্থ পছন্দের স্ট্রাইকার! এমবাপ্পে বলেন, “কোচ আমাকে জানিয়েছেন আমি মাস্তানতুয়োনো, ভিনিসিয়ুস ও গঞ্জালো থেকে পিছিয়ে। আমি কোচের সিদ্ধান্তের প্রতি রাগান্বিত নই, তবে আমি একাদশে ফেরার লড়াই চালিয়ে যাব।”
এমবাপ্পের এই মন্তব্যে যেন আকাশ থেকে পড়লেন রিয়াল বস আলভারো আরবেলোয়া। সংবাদ সম্মেলনে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমার তো চারজন ফরোয়ার্ডই নেই! আমি তাকে চতুর্থ পছন্দের ফরোয়ার্ড বলতে পারি না। হয়তো সে আমার কথা ভুল বুঝেছে।” তবে সুর নরম করার বদলে আরবেলোয়া নিজের কর্তৃত্ব জাহির করে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “আমি কোচ, কে খেলবে তা আমিই ঠিক করব। যে চার দিন আগে বেঞ্চে বসার মতো ফিট ছিল না, তাকে একাদশে না রাখাটাই যৌক্তিক।”
ড্রেসিংরুমে গৃহদাহ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
রিয়াল মাদ্রিদের এই অস্থিরতা নতুন কিছু নয়। মৌসুমে মাঝপথে জাবি আলোনসোকে সরিয়ে আরবেলোয়াকে দায়িত্ব দিলেও সাফল্যের মুখ দেখেনি দল। বরং ফেদে ভালভার্দে ও চুয়ামেনির মারামারির খবর কিংবা এমবাপ্পের এই সরাসরি চ্যালেঞ্জ প্রমাণ করে, ড্রেসিংরুমের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়েছেন আরবেলোয়া। শিরোপাহীন আরেকটি মৌসুম শেষ করতে যাওয়া রিয়ালের অন্দরমহলে এখন কেবলই অবিশ্বাসের ছায়া।
এমবাপ্পে জাবি আলোনসোর প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা লুকাননি, যা বর্তমান কোচ আরবেলোয়ার জন্য এক পরোক্ষ বার্তা। বার্নাব্যুর সেই সন্ধ্যায় গ্যালারিতে কেবল এমবাপ্পে বিরোধী শিসই নয়, বরং সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের পদত্যাগ দাবি করা ব্যানারও দেখা গেছে।
মৌসুমের শেষভাগে গতিরুদ্ধ রিয়াল
৩৬ ম্যাচে ৯১ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থাকা বার্সেলোনার চেয়ে ১১ পয়েন্ট পিছিয়ে আছে রিয়াল মাদ্রিদ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা রিয়ালের সামনে এখন কেবল সম্মান বাঁচানোর লড়াই। কিন্তু মাঠের ফুটবলের চেয়ে যখন ‘গৃহদাহ’ বড় সংবাদ হয়ে দাঁড়ায়, তখন জয়গুলোও ম্লান হয়ে যায়। এমবাপ্পের অ্যাসিস্টে জুড বেলিংহাম গোল করলেও, বার্নাব্যুর বাতাস এখন বিষাক্ত। এমবাপ্পে কি পারবেন তাঁর পরিশ্রম দিয়ে আবার ভিনিসিয়ুস-মাস্তানতুয়োনোদের টপকে পছন্দের তালিকায় শীর্ষে ফিরতে? নাকি আরবেলোয়ার বিদায়ের পর নতুন কোচের আগমনেই ঘটবে এই নাটকের সমাপ্তি? উত্তর তোলা রইল লা লিগার শেষ দুই ম্যাচের জন্য।
আরও পড়ুন:
ভালভার্দে-চুয়ামেনি কাণ্ডে কঠোর রিয়াল মাদ্রিদ দিচ্ছে ‘সর্বোচ্চ’ শাস্তি!

