সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর যে ঘাসে একদিন কিলিয়ান এমবাপ্পেকে বরণ করে নিতে লক্ষাধিক মানুষের উন্মাদনা ছিল, আজ সেখানেই বইছে বিদায়ের সুর। রিয়াল মাদ্রিদে ফরাসি এই বিশ্বকাপজয়ীর ‘মধুচন্দ্রিমা’ পর্ব শুধু শেষই হয়নি, বরং তা পরিণত হয়েছে এক দুঃস্বপ্নে। শিরোপাহীন ও ব্যক্তিগতভাবে চরম ব্যর্থ মৌসুম কাটানোর পর মাদ্রিদে এমবাপ্পের ভবিষ্যৎ এখন খাদের কিনারায়। পরিস্থিতি এতটাই প্রতিকূল যে, তাঁকে ক্লাব থেকে তাড়াতে প্রায় ৭ কোটি (৭০ মিলিয়ন) সমর্থক গণস্বাক্ষর দিয়েছেন—যা ফুটবল ইতিহাসে নজিরবিহীন।
৪০০ মিলিয়ন ইউরোর ‘বিশাল’ বাধা
এমবাপ্পেকে নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক ফুটবল বাজার উত্তাল, তখন ‘গোল ডটকম’ এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে।
স্পোর্টস ফিন্যান্স বিশেষজ্ঞ ডক্টর রব উইলসনের মতে, এমবাপ্পেকে রিয়াল থেকে দলে ভেড়াতে যেকোনো ক্লাবের প্রয়োজন হবে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ইউরোর এক অবিশ্বাস্য ট্রান্সফার প্যাকেজ। যদিও তিনি ফ্রি এজেন্ট হিসেবে রিয়ালে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সাইনিং বোনাস, ইমেজ রাইটস এবং বিশাল বেতন মেটাতে রিয়ালকে ইতোমধ্যেই প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ইউরোর আর্থিক প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে।
রদ্রিগো বা ভিনিসিয়ুসদের দাপটের মাঝে এমবাপ্পের এই বিশাল খরচ এখন রিয়াল কর্তৃপক্ষের জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিয়াল প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ এমবাপ্পের জন্য নেইমারের সেই ঐতিহাসিক ২২২ মিলিয়ন ইউরোর রেকর্ড ভাঙতে চান।
বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে এই অঙ্ক ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে যাবে, যা ইউরোপের অধিকাংশ ক্লাবের সাধ্যের বাইরে।
আরও পড়ুন:
এমবাপ্পেকে নিয়ে ক্ষুব্ধ রিয়াল মাদ্রিদ, একা হয়ে পড়ছেন ফরাসি তারকা
গন্তব্য যখন মরুভূমি কিংবা এমিরেটস
এত বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করার সামর্থ্য এই মুহূর্তে কেবল সৌদি আরবের ক্লাবগুলোরই রয়েছে। ২০৩৪ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে সৌদি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ) এমবাপ্পেকে তাঁদের ফুটবলের বৈশ্বিক ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে পেতে মরিয়া।
অন্যদিকে, আর্সেনালের সাবেক তারকা ইমানুয়েল পেতিত মনে করেন, যদি পেরেজ জনরোষের চাপে নতিস্বীকার করেন, তবে গানারদের সামনে এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হতে পারে। এমবাপ্পে নিজে ব্যর্থতার তকমা নিয়ে মাদ্রিদ ছাড়তে চান না, তবে সতীর্থদের সঙ্গে ড্রেসিংরুমের দ্বন্দ্ব এবং কোচিং স্টাফদের সঙ্গে দূরত্বের কারণে তাঁর প্রস্থান এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ব্যর্থতার খতিয়ান ও ‘ব্র্যান্ড’ বিড়ম্বনা
এমবাপ্পের ক্লাবভাগ্য নিয়ে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে ট্রল। পিএসজির হয়ে সাত বছর চেষ্টা করেও চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে পারেননি, অথচ তিনি ক্লাব ছাড়ার পর পিএসজি এখন ইউরোপসেরা হওয়ার দৌড়ে ফাইনালে উঠেছে। রিয়ালের হয়ে গত দুই মৌসুমে বড় কোনো ট্রফি তো আসেইনি, বরং চলতি মৌসুমে বার্সেলোনার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ইনজুরির বাহানা দিয়ে মাঠ ছেড়ে যাওয়ার ঘটনায় সমর্থকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। চোটের সময় বান্ধবীর সঙ্গে ইয়টে ছুটি কাটানোর ছবি প্রকাশ পাওয়ার পর তাঁর পেশাদারিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে এখন এমবাপ্পের ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ নিয়েই আলোচনা বেশি। নাইকি কিংবা ইএ স্পোর্টসের মতো বড় স্পন্সরদের কাছে তিনি ফুটবলীয় সম্পদের চেয়েও বড় বাণিজ্যিক বিনিয়োগ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ৩৫০-৪০০ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে এই ‘অশান্ত’ তারকাকে কি কোনো ক্লাব এই মুহূর্তে নিতে চাইবে? নাকি ফুটবলের রাজপুত্রকে শেষ পর্যন্ত ইউরোপ ছেড়ে মরুর দেশেই পাড়ি জমাতে হবে? ফুটবল বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
আরও পড়ুন:
‘এমবাপ্পের স্বার্থপরতা রিয়াল মাদ্রিদকে ধ্বংস করে দিচ্ছে’

