পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করে লিটন দাসের উদযাপন।সিলেট টেস্টে সেঞ্চুরি করেছেন লিটন দাস।

বলটা কাভারে পাঠিয়েই দৌড় শুরু করেছিলেন লিটন কুমার দাস। মাথায় ঘুরছিল দুই রান নিয়ে সেঞ্চুরির ম্যাজিক ফিগার ছোঁয়ার তাড়না। কিন্তু এক রানের বেশি মিলল না। অন্য প্রান্তে গিয়ে যখন দাঁড়ালেন, লিটনের মুখে তখন রাজ্যের হতাশা ও শঙ্কা। কারণ স্ট্রাইকিং প্রান্তে তখন দলের ৯ নম্বর ব্যাটার শরীফুল ইসলাম, আর বাংলাদেশের উইকেট বাকি মাত্র একটি! একটু পরেই সেই চেনা শঙ্কা সত্যি হলো—সাজিদ খানের বলে এলবিডব্লিউর জোরালো আবেদনে আঙুল তুলে দিলেন আম্পায়ার।

৯৯ রানে দাঁড়িয়ে তখন লিটন, ওদিকে শরিফুল আউট হলে সেঞ্চুরি অধরাই থেকে যাবে। তবে ভাগ্যিস, রিভিউ নিয়ে সে যাত্রা বেঁচে যান শরীফুল। শ্বাসরুদ্ধকর সেই ওভার শেষ হতেই আম্পায়ার ডাকলেন ড্রিংকস ব্রেক। অবশেষে বিরতি কাটিয়ে ফিরে দ্বিতীয় বলেই বাউন্ডারি মেরে ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন লিটন।

সিলেট টেস্টের প্রথম দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে সেই নার্ভাস নাইনটিজের গল্প শোনালেন এই সেঞ্চুরিয়ান, “তখন অনেক টেনশনে ছিলাম। বিশেষ করে যখন শরীফুলের পায়ে বল লেগেছিল। ও অনেক লম্বা, তাই আমি ওকে বারবার বলছিলাম ব্যাক ফুটে না গিয়ে সামনে এসে খেলতে। তবে ও শেষ পর্যন্ত আমাকে খুব ভালো সাপোর্ট দিয়েছে।”

আরও পড়ুন:
সিলেটে লিটনের সেঞ্চুরি: ২৫৭ রানে এগিয়ে দিন শেষ করল বাংলাদেশ

টেল-এন্ডারদের আড়াল করার রণকৌশল

১১৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে দল যখন ধ্বংসস্তূপে, তখন তাইজুল, তাসকিন ও শরীফুলকে নিয়ে একাই লড়াই টানেন লিটন।

বাঁহাতি ব্যাটারদের পেয়ে পাকিস্তান অধিনায়ক যখন অফ-স্পিনার সাজিদ খানকে দিয়ে টানা বল করাচ্ছিলেন, তখন টেল-এন্ডারদের আড়াল করতে বিশেষ ছক কষেছিলেন লিটন।

তিনি বলেন, “আমাদের টেল-এন্ডাররা তো এতটা ভালো নয় যে আমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে ওদের হাতে পুরো ৬টা বল ছেড়ে দেব। একজনকে স্ট্রাইক দিয়েছিলাম, সে প্রথম বলেই আউট হয়ে যাওয়ার পর আমরা সতর্ক হয়ে যাই। পরিকল্পনা ছিল ওদেরকে যত কম পারা যায় (১ বা ২ বল) স্ট্রাইক দেওয়া।”

“ভাগ্যবান? কখনো ভাগ্যেরও দরকার আছে!”

লিটনের ১৫৯ বলে ১২৬ রানের এই মহাকাব্যিক ইনিংসের পর পাকিস্তানের পেসার খুররম শেহজাদ সংবাদ সম্মেলনে এসে খোঁচা দিয়ে বলেন, লিটন আজ চরম ভাগ্যবান ছিলেন। মূলত লিটন যখন ৫২ রানে, তখন শেহজাদের বলে তাঁর গ্লাভস ছুঁয়ে বল কিপার মোহাম্মদ রিজওয়ানের হাতে গেলেও পাকিস্তান রিভিউ নেয়নি।

শেহজাদের দাবি, সেই সুযোগগুলো নিলে বাংলাদেশ ২০০ রানের আগেই অলআউট হতো।

শেহজাদের এই মন্তব্যের জবাবে মুচকি হেসে লিটন বলেন, “ভাগ্যবান? ঠিক আছে, কখনো ভাগ্যেরও দরকার আছে। ক্রিকেটে তো সব সময় আপনার একশতে একশ হবে না। তবে নির্দিষ্ট দিনে ভাগ্য সহায় হলে সেটা কাজে লাগে।”

ড্রেসিংরুমের সেই গোপন বার্তা

যখন উইকেটে যান, পরিস্থিতি তখন বেশ কঠিন। মুশফিক ও মিরাজ দ্রুত বিদায় নিলে লিটন ড্রেসিংরুমে একটি বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছিলেন।

লিটন নিজেই সেই কৌশল ফাঁস করলেন, “শুরুতে যখন আমাদের দ্রুত উইকেট পড়ে গেল, আমি ড্রেসিংরুমে বার্তা পাঠালাম যে আমি কি আক্রমণাত্মক খেলব? ওখান থেকেও ইতিবাচক সাড়া আসে যে—হ্যাঁ, তুমি আক্রমণাত্মক খেলো। মাথায় ছিল, যদি মারতে গিয়ে আরও ৩০ রান করেও অলআউট হই, অন্তত কঠিন কন্ডিশনে আমাদের বোলাররা দ্রুত বল করার সুযোগ পাবে। আবার বৃষ্টি এলে সেই ১০ ওভারের খেলাও পঞ্চম দিনে সাহায্য করবে। পরে উইকেটে থিতু হওয়ার পর হিসাবটা আস্তে আস্তে বদলে গেছে।”

লিটনের এই দুর্দান্ত সেঞ্চুরি ও পাল্টা আক্রমণের ওপর ভর করেই প্রথম ইনিংসে ২৭৮ রান তুলতে পেরেছে বাংলাদেশ, যা দিনশেষে বোলারদের লড়াই করার পুঁজিখানি এনে দিয়েছে।

আরও পড়ুন:
নিজেকে বাংলাদেশের ‘সর্বকালের সেরা ক্যাপ্টেন’ বললেন লিটন দাস