সানরাইজার্স হায়দরাবাদের ড্রেসিংরুমে বসে ছয় জোড়া ‘অ্যাডিডাস অ্যাডিপাওয়ার’ ক্রিকেট জুতো নিয়ে কথা বলার সময় কিছুটা লজ্জিত হয়ে পড়েন সাকিব হুসেইন। এই জুতো অবশ্য তিনি নিজে কেনেননি। তাঁরই সানরাইজার্স সতীর্থ ও বিহারের বড় ভাই ইশান কিষাণ এবারের আসরে খেলার জন্য তাঁকে উপহার দিয়েছেন এই হাফ ডজন জুতো। এই মহামূল্যবান জুতো জোড়া আঁকড়ে ধরে ২০ পেরোনো সাকিবের স্মৃতি চলে যায় কয়েক বছর পেছনে। সাকিবের ভাষায়, “একটা সময় ছিল যখন আমার কোনো ভালো জুতোই ছিল না। ১২-১৫ হাজার রুপি দামের জুতো পরা তো আমার জন্য কল্পনারও বাইরে ছিল।”
বিহারের গোপালগঞ্জের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম সাকিবের। যখন ১৬ বছর বয়স, তখন তাঁর বাবা আলী আহমেদ হাঁটুর সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে শারীরিক পরিশ্রমের ক্ষমতা হারান। বড় ভাই আকিবকে নিয়ে একদিকে খেতখামার সামলানো, অন্যদিকে স্থানীয় টেনিস বল ক্রিকেটে ৩০০ রুপির চুক্তিতে খেলা—এভাবেই কাটছিল সাকিবের দিন। কিন্তু টেনিস বলের সেই ক্ষ্যাপ খেলাই একসময় সাকিবের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ২০০-৩০০ রুপির ফুটপাতের জুতো পরে বোলিং করতে গিয়ে বারবার সোলে ফাটল ধরত, স্পাইক না থাকায় পা পিছলে গোড়ালি মচকে যেত প্রতিনিয়ত।
এই মুহূর্তে সাকিবের সহায়তায় এগিয়ে আসেন তাঁর মা। ছেলের স্বপ্নকে মরতে দেননি মা সুবুক্তারা খাতুন। নিজের বিয়ের সময় বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া গহনা বিক্রি করে সাকিবের হাতে তুলে দিয়েছিলেন জুতোর টাকা।
সেই স্মৃতি স্মরণে সাকিব হুসেইন আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “সেখান থেকেই আসলে আমার আসল যাত্রা শুরু হয়েছিল।”
সমালোচকদের জবাব ও আইপিএলের আঙিনায় পা
সাকিবের প্রতিভা দেখে অনেকেই তখন টিপ্পনী কেটে বলত, ‘তোমার মতো লাখ লাখ খেলোয়াড় ঘুরে বেড়াচ্ছে, তুমি কিছুই করতে পারবে না।’
কিন্তু মুখে জবাব না দিয়ে কঠোর পরিশ্রমে নিজেকে চেনা ছন্দে ফেরান সাকিব হুসেইন। পাশে পান স্থানীয় ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন ও কোচ রবিন সিংকে। ২০২৪ আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্স তাঁকে দলে নিলেও ম্যাচ খেলার সুযোগ দেয়নি।
তবে ২০২৬ আইপিএলের মেগা নিলামে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ সাকিবের ভেতরের আগুনকে চিনে নিতে ভুল করেনি।
পেস বোলিং কোচ বরুণ অ্যারন ও অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের অধীনে এসে চলতি মৌসুমেই বাজিমাত করেন এই তরুণ তুর্কি।
অভিষেক ম্যাচেই তোলপাড় ও দুবে বধের গল্প
রাজস্থান রয়্যালসের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচেই ৪ উইকেট নিয়ে হইচই ফেলে দেন সাকিব হুসেইন। এরপর চেন্নাই সুপার কিংসের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ম্যাচে দলের কঠিন মুহূর্তে ডেথ ওভারে কোচের আস্থার প্রতিদান দেন তিনি। ক্রিস গেইলের মতো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা শিভম দুবেকে দুর্দান্ত এক রিভার্স সুইং ইয়র্কারে বোল্ড করে হায়দরাবাদের জয় নিশ্চিত করেন এই তরুণ। সিএসকে-র বিপক্ষে ফিরতি পর্বেও লেগ স্টাম্পে পিচ করা এক মরণ কাটারে বোকা বানান দুবেকে।
সাকিবের বোলিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, ১৪০ কিলোমিটার গতির ঠিক পরের বলেই তিনি গতি নামিয়ে ১০৫-এ নিয়ে আসতে পারেন। আইপিএলে করা নিজের ২২৮টি ডেলিভারির মধ্যে ১০৪টিই তিনি করেছেন স্লোয়ার বল!
স্বপ্নের উইকেট: বিরাট কোহলি!
আইপিএলের লিগ পর্বের শেষ ম্যাচে গত উইকএন্ডে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বিপক্ষে হায়দরাবাদের স্লো উইকেটে নিজের স্বপ্নের উইকেটটি শিকার করেন সাকিব হুসেইন। অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের পরামর্শে কোহলিকে টানা স্লোয়ার দিয়ে বিভ্রান্ত করেন তিনি।
ষষ্ঠ ওভারের পঞ্চম বলে কোহলির উইকেট নেওয়ার পর সাকিবের আনন্দ ছিল দেখার মতো।
ম্যাচ শেষে হাসিমুখে সাকিব বলেন, “বিরাট কোহলি ভাইয়ের এই উইকেটটি আমি আজীবন মনে রাখব।”
রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর করা ২৫৪ রানের জবাবে হায়দরাবাদ ১৬২ রানে অলআউট হলেও সাকিবের বোলিং পারফরম্যান্স ছিল প্রশংসনীয়।
চোট কাটিয়ে ফেরা অধিনায়ক প্যাট কামিন্স এবং বোলিং কোচ বরুণ অ্যারনের পূর্ণ সমর্থন সাকিবের আত্মবিশ্বাসকে নিয়ে গেছে এক অন্য উচ্চতায়। কামিন্স তো সাকিব ও শ্রীলঙ্কান পেসার এশান মালিঙ্গাকে ‘ক্যাপ্টেনের স্বপ্ন’ (Captain’s Dream) বলে আখ্যা দিয়েছেন।
গোপালগঞ্জের এই ছেলেটির একমাত্র লক্ষ্য এখন তাঁর বাবা-মাকে সুখে রাখা। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে সাকিব একটি ভিডিও ক্লিপ দেখেন, যেখানে তাঁর বাবা কাঠের খাটে বসে ছেলের আইপিএলে সুযোগ পাওয়ার খবরে আনন্দের অশ্রু ফেলছেন।
সাকিব হুসেইন বলেন, “ওই ভিডিওটা আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, আমি কোথা থেকে উঠে এসেছি।”
আরও পড়ুন:
আইপিএল ২০২৬: তুরুপের তাস সাকিব, অবহেলা করেছিল কলকাতা!

