Paris Saint-Germain players celebrating their historic back-to-back Champions League title.টানা দ্বিতীয় শিরোপা নিয়ে পিএসজির উল্লাস। ছবি: গেটি ইমেজেস

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৫টি শিরোপা জিতে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ যে অনন্য উচ্চতায় বসে আছে, সেখানে পৌঁছানো যেকোনো দলের জন্যই এক অলীক স্বপ্ন। তবে টুর্নামেন্টের নাম বদলে ১৯৯২ সালে ‘চ্যাম্পিয়ন্স লিগ’ ফরম্যাট চালু হওয়ার পর একমাত্র দল হিসেবে শিরোপা ধরে রাখার যে ঐতিহাসিক কীর্তি রিয়ালের ছিল, এবার আধুনিক ফুটবলের সেই মেগা রেকর্ডে ভাগ বসালো প্যারিস সেইন্ট জার্মেই (পিএসজি)।

যদিও ইউরোপিয়ান কাপ আমলে আয়াক্স, বায়ার্ন মিউনিখ ও ইন্টার মিলানের শিরোপা ধরে রাখার নজির আছে, তবে আধুনিক চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এতকাল রিয়ালই ছিল একমাত্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

রিয়াল মাদ্রিদ ২০১৬-২০১৮ মৌসুমে টানা দুবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে নেয়।

পিএসজি কোচ লুইস এনরিকে ম্যাচের আগেই বলেছিলেন, ‘চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন। কাজটা সহজ নয়, তবে এই সুযোগ আমাদের কাজে লাগাতে হবে।’

অবশেষে বুদাপেস্টের পুসকাস অ্যারেনায় সেই কঠিন সুযোগ কাজে লাগিয়েই ইতিহাস গড়ল ফরাসি জায়ান্টরা।

শনিবার রাতে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ২০২৬ সংস্করণের মেগা ফাইনালে ফুটবল বিশ্ব দেখল এক চরম ট্যাকটিক্যাল ও স্নায়ুর লড়াই।

নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ সমতায় থাকার পর টাইব্রেকারের রোমাঞ্চকর স্নায়ুযুদ্ধে মিকেল আর্তেতার আর্সেনালকে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে ব্যাক-টু-ব্যাক চ্যাম্পিয়ন হলো লুইস এনরিকের দল। দীর্ঘ ১০ বছর পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল পেনাল্টি শুটআউটে গড়ায়, যেখানে গানার্সদের স্তব্ধ করে রিয়ালের (২০১৬-২০১৮) পর দ্বিতীয় ক্লাব হিসেবে টানা দুইবার এই ট্রফি জেতার অনবদ্য রেকর্ড গড়ল প্যারিস।

ম্যাচের শুরুতেই অবশ্য পুসকাস অ্যারেনাকে স্তব্ধ করে উল্লাসের উপলক্ষ পেয়েছিল গানার্সরা।

মাত্র ৬ মিনিটের মাথায় পিএসজি ডিফেন্ডার মার্কিনহোসের একটি ক্লিয়ারেন্স আর্সেনাল উইঙ্গার লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ডের গায়ে লেগে প্রতিহত হলে বল পেয়ে যান জার্মান ফরোয়ার্ড কাই হাভার্টজ। হাফ-ওয়ে লাইনের কাছ থেকে একক প্রচেষ্টায় বল নিয়ে বক্সে ঢুকে এক দুর্দান্ত কোনাকুনি শটে পিএসজির জালের ছাদ কাঁপিয়ে গানার্সদের ১-০ গোলে এগিয়ে নেন হাভার্টজ।

তবে প্রথমার্ধে লিড ধরে রাখলেও দ্বিতীয়োয়ার্ধের শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় আর্সেনাল।

৪৬ মিনিটে ক্রিস্টিয়ান মসকেরা হলুদ কার্ড দেখার পর ম্যাচের খেই হারাতে শুরু করে তারা। এর মধ্যে ৫৪ মিনিটে বুকায়ো সাকাও হলুদ কার্ড দেখেন।

দেম্বেলের পেনাল্টি গোল ও ট্যাকটিক্যাল দাবার চাল

ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট আসে ৬৫ মিনিটে, যখন পিএসজির ডি-বক্সের ভেতর জর্জিয়ান উইঙ্গার কাভারাস্কেইয়াকে ফাউল করে বসেন মসকেরা। জার্মান রেফারি ড্যানিয়েল সিবার্ট পেনাল্টির বাঁশি বাজানোর পাশাপাশি মসকেরাকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের কারণে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ ছাড়া করেন।

দীর্ঘ ভিএআর (VAR) চেক শেষে স্পট কিক থেকে নিখুঁত শটে গোল করে পিএসজিকে সমতায় ফেরান উসমান দেম্বেলে।

১০ জনের আর্সেনালকে চেপে ধরতে ৬৬ মিনিটে জুরিয়েন টিম্বার, ওডেগার্ড এবং ভিক্টর ডিয়োকেরেসকে তুলে নিয়ে পুরোপুরি রক্ষণাত্মক কৌশলে যান আর্তেতা। বিপরীতে ৯০ মিনিটে গোলদাতা দেম্বেলে ও গনসালো রামোসকে তুলে নিয়ে বারকোলা ও জোয়াও নেভেসকে মাঠে নামান এনরিকে।

৯০ মিনিটের পর অতিরিক্ত সময়ে দুই দলের কোচদের খেলোয়াড় বদলের দাবায় ম্যাচ আরও জমে ওঠে।

অতিরিক্ত সময়ে নুনো মেন্দেসের হলুদ কার্ড এবং ১০৩ মিনিটে ডেক্লান রাইসের হলুদ কার্ডের পাশাপাশি ডাগআউটে হলুদ কার্ড দেখেন আর্সেনাল বস মিকেল আর্তেতাও।

টাইব্রেকার ট্র্যাজেডি ও পিএসজির মহাকাব্যিক জয়

অতিরিক্ত সময়েও আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় ভাগ্যনির্ধারণী পেনাল্টি শুটআউটে, যা রূপ নেয় চরম নাটকীয়তায়।

পিএসজির হয়ে প্রথম দুটি শটে গনসালো রামোস ও দেশিরে দুয়ে গোল করলেও তৃতীয় শটে ব্যর্থ হন নুনো মেন্দেস। তবে আশরাফ হাকিমি ও লুকাস বেরালদো পরের শটগুলোতে গোল করে ফরাসিদের ম্যাচে রাখেন।

অন্যদিকে আর্সেনালের হয়ে ভিক্টর ডিয়োকেরেস ও এবারেশি এজে প্রথম দুই শটে গোল করলেও তৃতীয় শটে ব্যর্থ হন ডেক্লান রাইস।

চতুর্থ শটে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি গোল করে আশা বাঁচিয়ে রাখলেও পঞ্চম ও চূড়ান্ত শটে আর্সেনালের ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল মাগাহায়েস বল ক্রসবারের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারলে নিশ্চিত হয়ে যায় পিএসজির ৪-৩ ব্যবধানের মহাকাব্যিক জয়।

পুরো ম্যাচে অসাধারণ পারফর্ম করে ম্যাচ সেরার পুরস্কার জেতেন উসমান দেম্বেলে।

আর্সেনালের প্রথম ট্রফি জয়ের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে আধুনিক চ্যাম্পিয়ন্স লিগের রাজমুকুট ধরে রাখল প্যারিস।

আরও পড়ুন:
প্যারিসের রূপকথা: ৬৬ বছর পর ৯ গোল, এ যেন শৈল্পিক থ্রিলার!