ম্যাচ শেষের পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য হয়ে থাকল একটি ছবি—মাথায় হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গ্যাব্রিয়েল মাগাহায়েস, আর তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছেন পিএসজি অধিনায়ক তথা ব্রাজিলের জাতীয় দল সতীর্থ মার্কিনহোস। নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম ইউরোপিয়ান ফাইনালটি এভাবে এক নির্মম ট্র্যাজেডিতে শেষ হবে, তা হয়তো ভাবেননি এই ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার। টাইব্রেকারে তার নেওয়া শেষ পেনাল্টি শটটি ক্রসবারের ওপর দিয়ে উড়ে যেতেই ফরাসি জায়ান্ট পিএসজির ডিলিরিয়াস গ্যালারি উল্লাসে ফেটে পড়ে, আর বুক ভেঙে চুরমার হয় গানার্সদের।
চলতি মৌসুমে যে খেলোয়াড়টি বারবার আর্সেনালের ত্রাতা হয়েছেন, ২০০৬ সালের পর ক্লাবের প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে তার এমন বিদায় কেউই আশা করেনি।
অবাক করা বিষয় হলো, আর্সেনালের জার্সিতে গ্যাব্রিয়েলের নেওয়া এটিই ছিল প্রথম পেনাল্টি। এবং প্রথমটিতেই তালগোল পাকালেন তিনি।
ম্যাচ শেষে গানার্স বস মিকেল আর্তেতা প্রকাশ করেন, “গ্যাব্রিয়েল নিজেই এই শটটি নিতে চেয়েছিল এবং সে এর জন্য অনুশীলনও করেছিল। সাধারণত আমাদের পেনাল্টি টেকার বুকায়ো সাকা, ওডেগার্ড বা হাভার্টজ। কিন্তু ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে অন্য খেলোয়াড়দেরও দায়িত্ব নিতে হয়।”
গ্যাব্রিয়েলের এই মিস যেন ২০০৮ সালের মস্কো ফাইনালের এক অভিশপ্ত স্মৃতি ফিরিয়ে আনল।
বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভে সাবেক আর্সেনাল ডিফেন্ডার ম্যাট আপসন এটিকে চেলসি কিংবদন্তি জন টেরির সেই বিখ্যাত ‘স্লিপ’ ও ট্র্যাজেডির সাথে তুলনা করে বলেন, “এটি পুরোপুরি জন টেরির সেই মুহূর্তগুলোর মতোই একটি।”
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে চেলসিকে শিরোপা জেতানোর সুযোগ পেয়েও টাইব্রেকারে পিছলে গিয়ে পোস্টে বল মেরেছিলেন টেরি।
রাইসের আবেগঘন বার্তা ও গ্যাব্রিয়েলের অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স
আর্সেনালের জন্য রাতটি স্বপ্নের মতো শুরু হয়েছিল।
মাত্র ৬ মিনিটের মাথায় পিএসজি গোলরক্ষক সাফোনভের মাথার ওপর দিয়ে কাই হাভার্টজ বল জালের ছাদে জড়ালে বুদাপেস্টের পুসকাস অ্যারেনা উল্লাসে মেতে ওঠে। পুরো ম্যাচে পিএসজি বল দখলে আধিপত্য দেখালেও কাভারাস্কেইয়া, উসমান দেম্বেলে এবং দেশিরে দুয়েদের গড়া ভয়ংকর আক্রমণভাগকে বোতলবন্দি করে রেখেছিলেন গ্যাব্রিয়েল। পুরো ম্যাচে পিএসজির আক্রমণ রুখে দিয়ে সর্বোচ্চ ১৩টি ক্লিয়ারেন্স করেন তিনি। লক্ষ্য ছিল ১৯৯৯ ও ২০০৮ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং ২০২৩ সালে ম্যানচেস্টার সিটির পর চতুর্থ ইংলিশ ক্লাব হিসেবে ‘প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ’ ডাবল জয়ের কীর্তি গড়া।
কিন্তু দেম্বেলের পেনাল্টি গোলে ম্যাচ ১-১ সমতায় ফেরার পর টাইব্রেকারে নাটকীয়তার শুরু হয়।
আর্সেনালের এবারেশি এজে শট মিস করার পর ডেভিড রায়া নুনো মেন্দেসের শট ঠেকিয়ে আশা বাঁচিয়েছিলেন। কিন্তু পঞ্চম শটে গ্যাব্রিয়েলের মিস সব শেষ করে দেয়। ম্যাচ শেষে টিএনটি স্পোর্টসে সতীর্থ ডেক্লান রাইস বলেন, “চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে পেনাল্টি মিস করা অত্যন্ত কষ্টের। কিন্তু আমরা ওর পাশে আছি। ফুটবল এমনই নিষ্ঠুর। ও না থাকলে আমরা এবার প্রিমিয়ার লিগ জিততে পারতাম না। গ্যাব্রিয়েল একজন মানুষ এবং খেলোয়াড় হিসেবে কতটা অসাধারণ, তা প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই।”
গ্যাব্রিয়েলের কান্নাভেজা রাত
পিএসজি যখন ট্রফি উঁচিয়ে ধরছিল, তখন গ্যাব্রিয়েলের চোখ মোছার দৃশ্য আর্সেনাল সমর্থকদের মনে দীর্ঘকাল ক্ষত হয়ে থাকবে।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আর্তেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সাইনিংগুলোর একজন ছিলেন এই ডিফেন্ডার। এই মৌসুমে আর্সেনালের ৬৩টি ম্যাচের মধ্যে ৪৮টিতেই মাঠে নেমেছিলেন তিনি, যেখানে ৯টি গোল ও অ্যাসিস্ট করেছেন—যা ওডেগার্ড বা গ্যাব্রিয়েল জেসুসের চেয়েও বেশি।
সেপ্টেম্বরে নিউক্যাসলের বিপক্ষে ৯৬ মিনিটের নাটকীয় জয়সহ অসংখ্য ম্যাচে আর্সেনালকে টেনেছেন তিনি।
সাবেক ম্যান সিটি ডিফেন্ডার নেডুম ওনোহা বিবিসি স্পোর্টসকে বলেন, “যে গ্যাব্রিয়েল পিএফএ প্লেয়ার অব দ্য ইয়ারের দৌড়ে আছেন, তার এমন মিস সত্যিই বুকভাঙা। তবে সবাই তার পাশে দাঁড়াবে, কারণ তাকে ছাড়া আর্সেনাল প্রিমিয়ার লিগ জিততে পারত না।”
ম্যাট আপসন যোগ করেন, “গ্যাব্রিয়েল নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিল। সে দায়িত্ব নেওয়ার সাহস দেখিয়েছে, এটাই বড় কথা। সামনে ব্রাজিলের হয়ে তার বড় একটা গ্রীষ্মকাল (কোপা আমেরিকা) পড়ে আছে, সে দ্রুতই এটা কাটিয়ে উঠবে।”
এক রাতের জন্য গ্যাব্রিয়েল আর্সেনালের ট্র্যাজেডির মুখ হতেই পারেন, তবে গানার্সদের বুদাপেস্টের ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে আসার মূল নায়কও ছিলেন তিনিই।
আরও পড়ুন:
টাইব্রেকার রোমাঞ্চে আর্সেনালকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় শিরোপা পিএসজির

