বুদাপেস্টের পুসকাস অ্যারেনায় মিকেল আর্তেতার আর্সেনালকে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে ইউরোপিয়ান ফুটবলের এলিটদের এক অনন্য উচ্চতায় জায়গা করে নিল প্যারিস সেইন্ট জার্মেই (পিএসজি)। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ সমতায় থাকার পর এই স্নায়ুযুদ্ধে জয়ী হয়ে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় ক্লাব হিসেবে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মুকুট ধরে রাখার এক বিরল কীর্তি গড়ল লুইস এনরিকের শিষ্যরা।
১৯৯৩ সালে আধুনিক ‘চ্যাম্পিয়ন্স লিগ’ ফরম্যাট চালুর পর এতকাল কেবল রিয়াল মাদ্রিদই (২০১৬-২০১৮) টানা শিরোপা জেতার রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রেখেছিল। এবার স্প্যানিশ জায়ান্টদের সেই একক রাজত্বে ভাগ বসাল ফরাসি চ্যাম্পিয়নরা।
টুর্নামেন্টের ৭১ বছরের সামগ্রিক ইতিহাসে পিএসজি মাত্র দশম ক্লাব, যারা টানা দুইবার ইউরোপ সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করল।
এর আগে ঠিক ১২ মাস আগে মিউনিখের ফাইনালে ইন্টার মিলানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের প্রথম শিরোপা জিতেছিল তারা।
ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত পিএসজি বস লুইস এনরিকে বলেন, “আমি মিশ্র অনুভূতিতে ভুগছি। উত্তেজনা, ক্লান্তি—সব মিলিয়ে অসাধারণ এক মুহূর্ত। আমরা এখনো চ্যাম্পিয়ন, টানা দুইবার—এটি সত্যিই অবিশ্বাস্য!”
আরও পড়ুন:
ইতিহাসে যা হয়নি, এনরিকের জন্য সেই প্রস্তাব পিএসজির
একাদশের ধারাবাহিকতা ও লুইস এনরিকের রাজত্ব
পিএসজির এই অবিস্মরণীয় সাফল্যের অন্যতম মূল চাবিকাঠি ছিল দলের অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা।
ইন্টার মিলানের বিপক্ষে গত বছরের ফাইনালে যে ১০ জন আউটফিল্ড খেলোয়াড় স্টার্টিং লাইনে ছিলেন, আর্সেনালের বিপক্ষেও সেই একই ১০ জন মাঠে নেমেছিলেন। একমাত্র পরিবর্তন ছিল গোলরক্ষক পজিশনে; ম্যানচেস্টার সিটিতে পাড়ি জমানো জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মার জায়গায় পোস্ট সামলেছেন নতুন সাইনিং মাটভে সাফোনভ।
লুইস এনরিকের অধীনে গত দুই বছরে বিশ্ব ফুটবলে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে পিএসজি। সম্ভাব্য ১০টি ট্রফির মধ্যে ৮টিই নিজেদের ক্যাবিনেটে তুলেছে তারা; কেবল গত গ্রীষ্মের ক্লাব বিশ্বকাপ এবং চলতি মৌসুমের ফ্রেঞ্চ কাপ হাতছাড়া হয়েছে তাদের।
ইউরোপিয়ান ফুটবলের জনপ্রিয় সাংবাদিক জুলিয়েন লরেন্স বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভে বলেন, “গত মরসুমের শিরোপাটি স্পেশাল ছিল, তবে এবারের লড়াইটি তারা বেশি উপভোগ করবে। কারণ এবার তাদের কঠিন লড়াই করে, কামব্যাক করে জিততে হয়েছে। ইন্টারের বিপক্ষে ম্যাচটি বড্ড সহজ ছিল। তবে ব্যাক-টু-ব্যাক জিতে তারা সর্বকালের সেরাদের তালিকায় নাম লেখাল।”
টানা দুইবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ/ইউরোপিয়ান কাপ জয়ী দলগুলো:
প্যারিস সেইন্ট জার্মেই: ২০২৫, ২০২৬
রিয়াল মাদ্রিদ: ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮ (এবং ১৯৫৬-১৯৬০ টানা ৫ বার)
এসি মিলান: ১৯৮৯, ১৯৯০
নটিংহাম ফরেস্ট: ১৯৭৯, ১৯৮০
লিভারপুল: ১৯৭৭, ১৯৭৮
বায়ার্ন মিউনিখ: ১৯৭৪, ১৯৭৫, ১৯৭৬
আয়াক্স: ১৯৭১, ১৯৭২, ১৯৭৩
ইন্টার মিলান: ১৯৬৪, ১৯৬৫
বেনফিকা: ১৯৬১, ১৯৬২
পরিসংখ্যানের পাতায় পিএসজির দাপট
এবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে শুধু ট্রফিই নয়, পরিসংখ্যানের সব বিভাগেও আধিপত্য দেখিয়েছে ফরাসি ক্লাবটি।
আসরের সর্বোচ্চ ৪৫টি গোল করার পাশাপাশি সর্বোচ্চ গড় বল দখল (৬০.৫%) ছিল লুইস এনরিকের দলের।
সাংবাদিক জুলিয়েন লরেন্স যোগ করেন, “পেপ গুয়ার্দিওলাও কখনো মেসিকে নিয়ে বার্সেলোনা কিংবা ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে টানা দুইবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিততে পারেননি। একবার জেতা আনন্দের, কিন্তু ব্যাক-টু-ব্যাক জয় সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। এই জয় দিয়ে ফরাসি ফুটবলেও একচ্ছত্র শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করল পিএসজি, মার্সেইকে (১টি শিরোপা) ছাড়িয়ে তারা এখন ফ্রান্সের সফলতম ক্লাব।”
এমবাপ্পেহীন পিএসজি ও এনরিকের জাদুর ছোঁয়া
২০২৩ সালের জুলাইয়ে যখন লুইস এনরিকে পিএসজির দায়িত্ব নেন, শুরুতে তিনি নাকি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন!
বিখ্যাত সাংবাদিক গিলেম বালাগ জানান, “এনরিকে প্রথমে বলেছিলেন, ‘তোমাদের দল তারকায় ঠাসা, আমি আগ্রহী নই।’ তবে ক্লাব যখন তাকে ফুটবল সংস্কৃতির পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দেয় এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের চেয়ে আকর্ষণীয়, আক্রমণাত্মক ফুটবলের দর্শন তৈরিকে প্রাধান্য দেয়, তখন তিনি রাজি হন।”
২০২৪ সালে ক্লাবের রেকর্ড গোলদাতা কিলিয়ান এমবাপ্পে বিনামূল্যে রিয়াল মাদ্রিদে চলে যাওয়ার পর অনেকেই পিএসজির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু এনরিকের জাদুতে এমবাপ্পের প্রস্থান দলটিকে আরও সুসংহত ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে। এমবাপ্পেহীন প্রথম মৌসুমেই (২০২৪-২৫) পিএসজি আগের মরসুমের চেয়ে ৪৪টি গোল বেশি করে!
বালাগ বলেন, “এনরিকে এক প্লেয়ারের ৫০ গোলের চেয়ে ৫ জন প্লেয়ারের ১০টি করে গোল বেশি পছন্দ করেন। এই মৌসুমে পিএসজির হয়ে ২০ জন ভিন্ন ভিন্ন খেলোয়াড় গোল করেছেন। এটি একটি সম্পূর্ণ যৌথ প্রয়াস।”
একই সাথে ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর মধ্যে পিএসজি সবচেয়ে কম হলুদ কার্ড দেখা দল, যা তাদের অবিশ্বাস্য মানসিক নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ।
এছাড়া ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে বার্সেলোনার গড়া এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ৪৫ গোলের ঐতিহাসিক রেকর্ডও স্পর্শ করেছে পিএসজি।
এলিট ম্যানেজারদের তালিকায় এনরিকে
এই শিরোপা জয়ের মাধ্যমে ফুটবল ইতিহাসের মাত্র পঞ্চম ম্যানেজার হিসেবে ৩টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের এলিট ক্লাবে প্রবেশ করলেন লুইস এনরিকে। এর আগে ২০১৫ সালে বার্সেলোনার হয়ে খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে এই স্বাদ পেয়েছিলেন তিনি।
৩ বা তার বেশি চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী এলিট কোচগণ:
কার্লো আনচেলত্তি: এসি মিলান (২০০৩, ২০০৭); রিয়াল মাদ্রিদ (২০১৪, ২০২২, ২০২৪)
লুইস এনরিকে: বার্সেলোনা (২০১৫); পিএসজি (২০২৫, ২০২৬)
পেপ গুয়ার্দিওলা: বার্সেলোনা (২০০৯, ২০১১); ম্যানচেস্টার সিটি (২০২৩)
জিনেদিন জিদান: রিয়াল মাদ্রিদ (২০১৬, ২০১৭, ২০১৮)
বব পেইসলি: লিভারপুল (১৯৭৭, ১৯৭৮, ১৯৮১)
ম্যাচ শেষে পুসকাস অ্যারেনার গ্যালারিতে পিএসজি সমর্থকরা লুইস এনরিকের বিশালাকার ব্যানার প্রদর্শন করেন। ট্রফি হাতে পাওয়ার পর সভাপতি নাসের আল-খেলাইফির সাথে নাচেন এনরিকে, আর খেলোয়াড়রা তাকে আকাশে ছুড়ে উদযাপন করেন।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফিটি একসময় প্যারিসের জন্য ছিল শুধুই এক দীর্ঘশ্বাস, লুইস এনরিকের ছোঁয়ায় সেটি এখন তাদের ঘরের চাবির মতোই নিয়মিত হয়ে উঠেছে।

