ফুটবল ইতিহাসের এক সোনালী ও অবিস্মরণীয় অধ্যায় রচনা করল বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। ইউরোপের মাটিতে ইউরোপীয় কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই রাজকীয় জয় তুলে নিয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। সান মারিনোর সেরাফাল্লে স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের ২-১ ব্যবধানে ধুলোবালি খাইয়ে দিল জামাল ভূঁইয়ার দল। এই ঐতিহাসিক মহাকাব্য লেখার মূল কারিগর অভিজ্ঞ রক্ষণভাগের সেনানি তপু বর্মণ। ম্যাচের ১৯ এবং ৮৬ মিনিটে তাঁর করা অসাধারণ দুটি গোলেই সান মারিনো বধ সম্পন্ন হলো।
এই অবিস্মরণীয় জয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ডাগআউটে প্রধান কোচ হিসেবে থমাস ডুলির অধ্যায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে শুরু হলো।
ক্ষুদ্র রাষ্ট্র সান মারিনো ভৌগোলিকভাবে ইতালির ভেতরে অবস্থিত হওয়ায় এই ম্যাচকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রবাসীদের মাঝে ছিল টানটান উত্তেজনা। রোম, ভেনিসসহ ইতালির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার বাংলাদেশি সমর্থক গ্যালারিতে এসে হাজির হয়েছিলেন।
পুরো গ্যালারি জুড়ে লাল-সবুজের জয়োধ্বনি আর উৎসবের আমেজ দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে এটি বাংলাদেশের কোনো অ্যাওয়ে ম্যাচ।
প্রথমার্ধে তপুর হেড ও সান মারিনোর জবাব
ম্যাচে নতুন স্ট্র্যাটেজি ও ৪-৩-৩ ছকে দল সাজিয়েছিলেন কোচ থমাস ডুলি। মাঝমাঠে অভিষেক হওয়া হামজা চৌধুরী ও সোহেল রানা সিনিয়রকে সাথে নিয়ে আক্রমণের দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন কাপ্তান জামাল ভূঁইয়া।
ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিট সান মারিনো বল পজিশন ও আক্রমণের গতিতে বাংলাদেশকে কিছুটা চেপে ধরলেও ধীরে ধীরে গুছিয়ে ওঠে ডুলির শিষ্যরা।
১৭ মিনিটে জামালের একটি জোরালো শট ডিফেন্ডাররা ব্লক করার পর, ১৯ মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত প্রথম গোল। মাঝমাঠ থেকে হামজা চৌধুরীর নেওয়া চমৎকার এক ফ্রি-কিক খুঁজে নেয় ডানপ্রান্তে থাকা শেখ মোরসালিনকে।
মোরসালিনের মাপা ক্রস থেকে বক্সে লাফিয়ে উঠে নিখুঁত হেডে বল জালে জড়ান তপু বর্মণ।
তবে লিড ধরে রাখার আনন্দ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ১২ মিনিট। ৩১ মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে ডিফেন্ডার তপু বর্মণের ছোট এক ভুলে সমতায় ফেরে সান মারিনো। ফিলিপ্পো বেরার্দির রক্ষণচেরা পাস রুখতে ব্যর্থ হলে বল পান ফরোয়ার্ড নিকোলাস জাকোপেত্তি। বক্সের ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে জাকোপেত্তির নেওয়া জোরালো শট গোলরক্ষক মিতুল মারমার হাতে লেগে জালে জড়িয়ে যায়।
এরপর খেলা কিছুটা শারীরিক ও আক্রমণাত্মক রূপ নেয়। ৩৩ মিনিটে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন দীর্ঘ দুই বছর পর জাতীয় দলে ফেরা রফিকুল ইসলাম। ৩৭ মিনিটে শেখ মোরসালিনের পাস থেকে নিশ্চিত গোলের সুযোগ হাতছাড়া করেন সাদ উদ্দিন। গোলকিপারকে একা পেয়েও তিনি পোস্টের ওপর দিয়ে বল মারলে ১-১ সমতায় প্রথমার্ধ শেষ হয়।
বদলি খেলোয়াড়ের চাল ও ৮৬ মিনিটের বুনো উল্লাস
দ্বিতীয়ার্ধে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের তলানিতে থাকা সান মারিনো (২১১তম) এবং বাংলাদেশের (১৮১তম) মধ্যকার লড়াইটি বেশ জমে ওঠে। আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের বিশেষ নিয়মে দুই দলের সমঝোতায় বেশ কিছু বদলি খেলোয়াড় মাঠে নামানো হয়।
ম্যাচের ৭৬ মিনিটে সোহেল রানা সিনিয়রকে তুলে নিয়ে মাঝমাঠের গতি বাড়াতে কাজেম শাহ কিরমানিকে মাঠে নামান কোচ ডুলি।
ম্যাচের ভাগ্য যখন ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক ৮৬ মিনিটে আবারও ত্রাতা হয়ে আসেন তপু বর্মণ। বক্সের ঠিক সামনে থেকে হামজা চৌধুরীর নেওয়া ফ্রি-কিক সরাসরি প্রতিপক্ষের বক্সে ড্রপ করে। সেখানে কেউ পা ছোঁয়াতে না পারলেও ফাঁকায় থাকা বিশ্বনাথ ঘোষ এক দর্শনীয় সাইড ভলি মারেন। সেই চলন্ত ভলিতে বুদ্ধিদীপ্তভাবে মাথা ছুঁইয়ে সান মারিনোর গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন তপু।
জয়ের সুবাস পেয়ে জার্সি খুলে মাঠে বুনো উল্লাসে মেতে ওঠেন এই ডিফেন্ডার। গ্যালারিতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরাও আনন্দে মেতে ওঠেন।
শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলের ঐতিহাসিক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে লাল-সবুজের বাংলাদেশ।
আরও পড়ুন:
ডুলির হাই-প্রেসিং ফুটবলে সান মারিনোতে জয়ের স্বপ্ন বাংলাদেশের

