দক্ষিণ আফ্রিকা সর্বশেষ ২০১০ সালে ভারতের মাটিতে টেস্ট ম্যাচ জিতেছিল। গ্রায়েম স্মিথের দল নাগপুর টেস্টে জয় তুলে নিয়েছিল। এরপর একটি জয়ের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা। প্রায় ১৫ বছর পেরিয়ে অবশেষে সেই অপেক্ষার শেষ হয়েছে।
কলকাতা টেস্টে রোববার ভারতকে ৩০ রানে হারিয়ে দিয়েছে টেম্বা বাভুমার দল। ১২৪ রানের লক্ষ্য তাড়ায় ৯৩ রানে অলআউট হয়েছে শুবমান গিলের ভারত।
এই টেস্টের কোনো ইনিংসেই কোনো ২০০ রানের ঘরে পৌঁছাতে পারেনি। ভারতের মাটিতে এমন ঘটনা প্রথম ঘটলো।
ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিং কেন এভাবে ব্যর্থ হলো, এ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। সাবেক অধিনায়ক ও কোচ অনিল কুম্বলে, সাবেক ক্রিকেটার হরভজন সিং, রবিচন্দ্রন অশ্বিন, ইরফান পাঠান ও চেতেশ্বর পুজারা সবাই মুখ খুলেছেন।
তাদের বক্তব্য থেকে ভারতের হারের পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করা যায় মোটাদাগে।
১. টার্নিং পিচে উল্টো ফল
দক্ষিণ আফ্রিকার মতো পেসনির্ভর দলকে আটকাতে উপমহাদেশের দলগুলো সাধারণত স্পিন কৌশলই অবলম্বন করে। ভারতও করেছে। ভারতের কোচ গৌতম গম্ভীর ম্যাচের পর অকপটে বলেছেন, তারা এমন একটি পিচই চেয়েছিলেন, যা প্রথম দিন থেকেই স্পিন করবে।
কিন্তু ভারতের এবারের কৌশল কাজে দেয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানদের মতো ভারতীয়রাও ব্যাটিংয়ে হাঁসফাঁস করেছেন। বরঞ্চ প্রোটিয়ারা দুই ইনিংসেই দেড়শ’র বেশি রান করলেও ভারত দ্বিতীয় ইনিংসে শ’র নিচেই গুটিয়ে গেছে।
যশস্বী জয়সওয়াল ও ধ্রুব জুরেল দুই ইনিংসেই ব্যর্থ হয়েছে। অভিজ্ঞ লোকেশ রাহুল ও ঋষভ পন্ত প্রথম ইনিংসে ভালো শুরুটা কাজে লাগাতে পারেননি।
ম্যাচের পর গম্ভীর ব্যাটারদেরকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন, ‘এই উইকেটে কোনো ভূত ছিল না। খেলা যাচ্ছে না এমন উইকেটও নয়। পিচ আমরা যেমনটা চেয়েছিলাম, সেটিই দেওয়া হয়েছিল।’
কিন্তু গেল বছরের তরতাজা বিভীষিকা কী করে ভুলে গেল ভারত? নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে স্পিননির্ভর উইকেট বানিয়ে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল তারা। আবারও একই উইকেট বানানোয় বিস্মিত স্পিন কিংবদন্তি কুম্বলে, ‘আমার মনে হয়েছে ভারত পিচ আর কন্ডিশন দেখে একটু বেশি ভয় পেয়েছিল। আর সেটা বল দেখা ও খেলার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।’
২. দুই ইনিংসেই ব্যাটিং ব্যর্থতা
১৮৯ আর ৯৩—দুই ইনিংস মিলিয়ে মাত্র ২৮২ রান করে ভারত। এই ব্যাটিং ব্যর্থতাই ভারতকে ডুবিয়েছে বলে মনে করছেন সাবেক ক্রিকেটার ও কোচরা।
তাদের মতে, ভারতের ব্যাটসম্যানরা দায়িত্ব নিয়ে খেলতে পারেননি। যাদের ওপর ভরসা ছিল, তারা হতাশ করেছেন। ঋষভ পন্তের কথাও এসেছে। আক্রমণাত্মক খেলতে গিয়ে দুই ইনিংসে তিনি করেছেন ২৭ ও ২ রান। সব উইকেটে যে আক্রমণ শানাতে নেই, সেটাই যেন ভুলে গেছেন পন্ত।
ভারত ‘এ’ দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন ধ্রুব জুরেল। তাকে নির্ভরযোগ্য মনে করেছিল ভারত। কিন্তু জাতীয় দলে খেলতে গিয়ে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। দুই ইনিংসে করতে পেরেছেন ১৪ ও ১৩ রান।
৩. বুমরার হাতে বল না দেওয়া
ঘাড়ের চোটে ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়া শুবমান গিলের অনুপস্থিতিতে ভারতকে নেতৃত্ব দেন পন্ত। কিন্তু তৃতীয় দিনে তার কিছু সিদ্ধান্ত প্রশ্ন তুলেছে। তৃতীয় দিন দক্ষিণ আফ্রিকাকে যেখানে দ্রুত অলআউট করে দেওয়ার চিন্তা করা উচিত, যেখানে জসপ্রিত বুমরা আছেন, সেখানে তাকে দিয়ে বোলিং শুরু না করানোটা ছিল বিস্ময়কর।
পন্ত বল তুলে দেন দুই বাঁহাতি স্পিনার অক্ষর প্যাটেল ও রবীন্দ্র জাদেজার হাতে। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার টেম্বা বাভুমা ও করবিন বশ তাদেরকে মোকাবেলা করে খানিকটা সহজেই রান তুলেন।
বাভুমা ৫৫ রানে অপরাজিত থাকেন। বশ করেন ২৫ রান। এই জুটিতে আসে ৪৪ রান। মূলত এই জুটিই সফরকারীদের দেড়শ রান পেরোতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। এই জুটি ভাঙতে দিনের শুরুতে বুমরাহ হতে পারতেন কার্যকর, যিনি নতুন বলে বা সকালের আর্দ্রতায় সবচেয়ে ভালো বোলিং করেন। কিন্তু তাকে আক্রমণে আনা হয় দিনের ১৩তম ওভারে। এসেই বশকে ফিরিয়ে জুটি ভাঙেন বুমরা।
৪. চার স্পিনার খেলানো
ভারতের একাদশ নির্বাচন নিয়েও সমালোচনা চলছে। চার স্পিনার খেলিয়েছে ভারত—জাদেজা, অক্ষর, কুলদীপ যাদব ও ওয়াশিংটন সুন্দর। সঙ্গে দুই পেসার বুমরা ও মোহাম্মদ সিরাজ।
কিন্তু গেল বছর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পুনে টেস্টে ১১ উইকেট নেওয়া সুন্দরকে এই ম্যাচে মাত্র এক ওভার বোলিং করানো হয়েছে!
সুন্দরকে ব্যাটিং করানো হয়েছে তিন নম্বরে। ইংল্যান্ড সফরে তিনে খেলা সাই সুদর্শনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সুন্দর নিচের দিকের ব্যাটসম্যান হিসেবে ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ কার্যকারিতা দেখিয়েছেন। কিন্তু তিন নম্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তাকে তুলে আনা অনেকেরই যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি।
বিশেষ করে সুদর্শন ও দেবদূত পাডিক্কালের মতো খেলোয়াড়রা থাকা সত্ত্বেও সুন্দরকে তিনে মানতেই পারছেন না অনেকে। স্পিনার হিসেবে কাজে লাগানো যাবে ভাবনা থেকেই তাকে একাদশে রাখা হলেও তার হাতে বল দেওয়া হয়নি। ফলে এই পরিকল্পনা কাজে লাগেনি।
৫. গিলের চোটে ধাক্কা
শুভমান গিল ভারতের প্রথম ইনিংসে মাত্র তিন বল খেলে ঘাড়ে চোট পান। দ্রুত তাকে মাঠ থেকে তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এরপর তিনি আর ম্যাচে ফিরতে পারেননি।
অর্থাৎ, প্রথম ইনিংসে গিলের ব্যাটিং পায়নি ভারত। দ্বিতীয় ইনিংসে দল যখন ধুঁকছে, তখনও গিলের ব্যাটের সহায়তা নিতে পারেনি স্বাগতিকরা।
গিলের না থাকাও ম্যাচে ভারতের হারের ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলেছে।

