অসাধারণ এক অর্জনের সামনে মুশফিকুর রহিম। বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ১০০তম টেস্ট খেলার দ্বারপ্রান্তে তিনি। তার ক্যারিয়ারের এই ঐতিহাসিক মুহুর্তে সাবেক সতীর্থ, সাবেক ক্রিকেটার, প্রতিপক্ষ সবার মুখে চলছে মুশফিক বন্দনা।

আগামী পরশু, বুধবার থেকে শুরু হবে বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট। এ টেস্টে মাঠে নামার মধ্য দিয়ে শততম টেস্ট খেলার ঘরে পা রাখছেন বাংলাদেশের ‘মি. ডিপেন্ডেবল’।

২০০৫ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক লর্ডস ময়দানে মুশফিকের অভিষেক। বিশ বছরের দীর্ঘ পথচলায় এখন তিনি গৌরবময় অর্জনের সামনে দাঁড়িয়ে।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই টেস্টে বাংলাদেশের অধিনায়ক ছিলেন হাবিবুল বাশার সুমন। দলে ছিলেন জাভেদ ওমর বেলিম, নাফিস ইকবাল, মোহাম্মদ আশরাফুল, আফতাব আহমেদ, খালেদ মাসুদ পাইলট, মোহাম্মদ রফিক, মাশরাফি বিন মর্তুজা, আনোয়ার হোসেন মনির ও শাহাদাত হোসেনরা। বহু আগে থেকেই তারা ‘সাবেক’। টিকে আছেন কেবল মুশফিক।

সেইসব সতীর্থ মুশফিকের অর্জনকে, যাত্রাকে কিভাবে দেখেন?

সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন বলেন, ‘নিশ্চিতভাবে মুশফিকের শততম টেস্ট খেলা কোনো ছোটখাটো ব্যাপার নয়। একশো টেস্ট যারা খেলেছে, তাদের নামের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন তারা কারা খেলেছে। সবাই কিংবদন্তি।’

‘…এই পর্যন্ত আসার জন্য আমি মুশফিককে স্যালুট জানাই। খুবই কঠিন কাজ। এতদিন ধরে ফিট থাকা। পারফর্ম করা। আমাদের মতো দেশের জন্য এটা অনেক কঠিন। সেটা ওর মাধ্যমে হতে যাচ্ছে দারুণ ব্যাপার। ও আমাদের সবার জন্য একটা উদাহরণ তৈরি করল যে ত্যাগ, পরিশ্রম, পারফর্ম করলে দীর্ঘদিন ক্রিকেট খেলা যায়।’

জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার নাফিস ইকবাল বলছিলেন, ‘মুশফিকের শুরুর সময়টাতেও ছিলাম, আর এখন দলের ম্যানেজার হিসেবে শততম টেস্টে তার পাশে আছি—এটা আমার জন্য বিশেষ আনন্দের। সে আমাদের কাছে নির্ভরতার প্রতীক। শততম টেস্টে ও মাঠে নামছে, এটা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসেরও গর্ব।’

একসময় বাংলাদেশের ক্রিকেটের মহাতারকা ছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল। কাছ থেকে দেখেছেন মুশফিকুর রহিমকে। আশরাফুল এখন জাতীয় দলের সঙ্গে ব্যাটিং পরামর্শক হিসেবে আছেন।

মুশফিক বন্দনায় কমতি রাখলেন না আশরাফুল, ‘মুশফিককে আমি ছোটবেলা থেকে দেখেছি। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন ধারাবাহিকতা খুব কম দেখা যায়, আর এটা সম্ভব হয়েছে শুধু একটি কারণে—তার অতুলনীয় শৃঙ্খলা। বিশ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকা কোনো সহজ কথা নয়। যারা খেলছে বা সামনে খেলবে, তাদের সত্যিই মুশফিককে রোল মডেল হিসেবে দেখা উচিত।’

ঢাকা টেস্টের আগে আজ সংবাদ সম্মেলনে আসেন আইরিশ কোচ হেনরিখ মালান। সেখানে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মুশফিকের কাছ থেকে কোন জিনিসটা নিতে বলবেন তাঁর দলের ক্রিকেটারদের? উত্তরে মালান অকপটে প্রশংসা করলেন মুশফিকের পেশাদারিত্বের।

বললেন, ‘আমি বলবো তাঁর পেশাদারত্ব। আমি ভোরে ওঠা মানুষদের একজন। প্রতিদিন সকাল পৌনে ছয়টায় তাঁকে হোটেলে দেখি নাশতা করছে। সবার আগে বাসে ওঠে। সে যখন মাঠে আসে, ওয়ার্ম আপ করে, ব্যাটিং অনুশীলন করে—তখনো বাকিরা হয়তো এসেই পৌঁছায়নি। যখন আপনি পর্দার আড়ালে এতো কিছু করবেন, তখন আপনার দিকে আলো আসবেই।’

বাংলাদেশের ইতিহাসে আরও অনেকে প্রতিভাবান ছিলেন, কেউ কেউ আরও রঙিন। কিন্তু মুশফিকের গল্প আলাদা। তিনি প্রতিভার চেয়ে বেশি ভরসা রেখেছেন শৃঙ্খলা, পরিশ্রমে এবং এক ধরনের কঠোর আত্মসমালোচনায়।

তার ব্যাটিং স্টাইল চওড়া নয়, চোখ ধাঁধানোও নয়। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটের গভীরতম দর্শন যেটা—
সৌন্দর্য সবসময় চিৎকার করে না, কখনো কখনো নীরবে টিকে থাকাই শিল্প। সেই শিল্পের অসাধারণ উদাহরণ মুশফিক।