মাত্র দুই দিনে শেষ হয়ে যাওয়া অস্ট্রেলিয়া–ইংল্যান্ডের বক্সিং ডে টেস্ট ঘিরে যখন বিশ্বজুড়ে পিচের আচরণ নিয়ে আলোচনা, তখনই সামনে এসেছে বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তিকর এক পরিসংখ্যান। আইসিসি নির্ধারিত পিচ ও আউটফিল্ড রেটিংয়ে টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অবস্থান করছে একেবারে নিচের দিকে!
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ (ডব্লিউটিসি) শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলোর রেটিং বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভালো উইকেট তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শুধু প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে পিছিয়েই নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
পিচ রেটিং কীভাবে কাজ করে
একটি টেস্ট ম্যাচে ব্যাট ও বলের ভারসাম্য কতটা বজায় থাকছে, সেটিই পিচ রেটিংয়ের মূল বিবেচ্য। ম্যাচ শেষে আইসিসি মনোনীত রেফারি পিচ ও আউটফিল্ড আলাদাভাবে মূল্যায়ন করে প্রতিবেদন জমা দেন।
বর্তমানে আইসিসির রেটিং চার ভাগে বিভক্ত—‘খুব ভালো’, ‘সন্তোষজনক’, ‘অসন্তোষজনক’ এবং ‘খেলার অযোগ্য’। আইসিসির ব্যাখ্যায়, একটি আদর্শ পিচে সীমিত সুইং বা টার্ন থাকবে, বাউন্স হবে ধারাবাহিক এবং সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে ক্ষয় হবে।
যে উইকেট ব্যাটসম্যান বা বোলার—কোনো এক পক্ষকে অযৌক্তিক সুবিধা দেয়, সেটি পড়ে ‘অসন্তোষজনক’ শ্রেণিতে। আর খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পিচকে ধরা হয় ‘খেলার অযোগ্য’ হিসেবে।
আউটফিল্ডের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট মানদণ্ড—সমতলতা, ঘাসের উপস্থিতি, বলের গতি এবং পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা।
রেটিংয়ের প্রভাব ও শাস্তির বিধান
রেটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত আছে ডিমেরিট পয়েন্ট। কোনো ভেন্যুর পিচ বা আউটফিল্ড ‘অসন্তোষজনক’ হলে পায় ১ পয়েন্ট, আর ‘খেলার অযোগ্য’ হলে ৩ পয়েন্ট।
পাঁচ বছরের মধ্যে ৬ ডিমেরিট পয়েন্ট জমলে ওই ভেন্যুতে এক বছরের জন্য আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন বন্ধ হয়ে যায়। ১২ পয়েন্ট হলে নিষেধাজ্ঞা বাড়ে দুই বছর পর্যন্ত।
ডব্লিউটিসিতে বাংলাদেশের হতাশাজনক অবস্থান
২০১৯ সালে শুরু হওয়া বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে এখন পর্যন্ত চারটি চক্রে মোট ২২৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। উইজডেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৯ দেশের ৫৮টি ভেন্যুর মধ্যে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স সবচেয়ে দুর্বল।
বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ১৩টি টেস্টের মধ্যে মাত্র ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ পিচ ‘খুব ভালো’ রেটিং পেয়েছে। এই সূচকে বাংলাদেশের নিচে কেবল শ্রীলঙ্কা, তাদের হার ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
উদ্বেগ বাড়াচ্ছে আরেকটি তথ্য—বাংলাদেশের পিচের ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ পেয়েছে ‘অসন্তোষজনক’ রেটিং, যেখানে শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে এই হার শূন্য।
তুলনায় নিউজিল্যান্ডে ৮১ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় ৪৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পিচ ‘খুব ভালো’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ইংল্যান্ড ও ভারতের অবস্থানও বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভালো।
কোন মাঠে ভালো, কোথায় সমস্যা
বাংলাদেশের তিনটি ভেন্যুর মধ্যে মাত্র দুটি ম্যাচে ‘খুব ভালো’ পিচ রেটিং এসেছে। দুটিই ২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে—একটি সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে, অন্যটি চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালের জুনে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ–নিউজিল্যান্ড টেস্টের পিচ পেয়েছিল ‘অসন্তোষজনক’ রেটিং।
আউটফিল্ডেও পিছিয়ে বাংলাদেশ
২২ গজের বাইরেও স্বস্তির জায়গা নেই। ১৩টি টেস্টের মধ্যে বাংলাদেশের মাত্র ৪৬ দশমিক ১৫ শতাংশ আউটফিল্ড ‘খুব ভালো’ রেটিং পেয়েছে।
এই সূচকে অস্ট্রেলিয়া (৯৩ দশমিক ৭৫%), নিউজিল্যান্ড (৯০ দশমিক ৯০%) ও ইংল্যান্ড (৮৫ দশমিক ৩৬%) অনেক এগিয়ে।
বাংলাদেশে মোট ছয়টি ম্যাচে আউটফিল্ড পেয়েছে ‘খুব ভালো’ রেটিং। তবে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সিলেটে বাংলাদেশ–নিউজিল্যান্ড টেস্টের আউটফিল্ডকে দেওয়া হয়েছিল ‘অসন্তোষজনক’ গ্রেড।
বড় প্রশ্ন বাংলাদেশের সামনে
টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য মানসম্মত পিচ ও আউটফিল্ড যে অপরিহার্য, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে—এই জায়গায় বাংলাদেশকে দ্রুত ও পরিকল্পিতভাবে এগোতে না পারলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে।

