Usman Khawaja

গুঞ্জন ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। অবসরের আভাসও মিলছিল। তবে টেস্ট শুরুর দুই দিন আগে হঠাৎ করে শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা—সব প্রশ্নের উত্তর যেন সেখানেই লেখা ছিল। আর সেটাই সত্যি হলো। এবারের অ্যাশেজের শেষ টেস্ট দিয়েই আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন উসমান খাজা।

১৫ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারের ইতি টানছেন ৩৯ বছর বয়সী এই অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান। বিদায়ের মঞ্চটাও বেছে নিয়েছেন নিজের গল্পের সবচেয়ে আপন জায়গায়—সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে।

শুরু, ফিরে আসা আর শেষ—সবই সিডনিতে

১৮ বছর আগে এই মাঠেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক খাজার। ১৫ বছর আগে এখানেই অ্যাশেজে পেয়েছিলেন স্বপ্নের টেস্ট ক্যাপ। আবার চার বছর আগে এই মাঠেই পুনরুজ্জীবন ঘটে তার টেস্ট ক্যারিয়ারের। দীর্ঘদিন যেটি ছিল ঘরের মাঠ, সেই প্রিয় আঙিনা থেকেই বিদায় নিচ্ছেন তিনি।

শুক্রবার সিডনিতে প্রায় ৫০ মিনিটের সংবাদ সম্মেলনে অতীতের দিকে ফিরে তাকান খাজা। আবেগ, গর্ব, লড়াই আর আক্ষেপ—সব মিলিয়ে এক মানবিক মুহূর্ত। পাশে ছিলেন স্ত্রী র‌্যাচেল, দুই মেয়ে, বাবা এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা।

সিদ্ধান্তটা হঠাৎ নয়

ফর্মহীনতা, বয়স আর পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন খাজা। এবারের অ্যাশেজের মাঝপথে বাদও পড়েছিলেন। যদিও বিদায়ের ঘোষণায় তিনি জানান, কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড তাকে আগামী ভারত সফর পর্যন্ত দলে রাখতে চেয়েছিলেন।

খাজা বলেন, “পুরোপুরি না হলেও এটা নিয়ে আমি কিছুদিন ধরেই ভাবছিলাম। এই সিরিজ শুরুর সময়ই মনে হচ্ছিল, এটিই হতে পারে আমার শেষ। র‌্যাচেলের সঙ্গে অনেক কথা হয়েছে। এটা বড় একটা সুযোগ ছিল।”

“দুয়ার পুরোপুরি বন্ধ করিনি। কয়েক দিন আগে যখন অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডকে বলি, তখনও তিনি ভাবছিলেন কীভাবে ভারত সফর পর্যন্ত (২০২৭) টিকে থাকা যায়।”

সুযোগ, চোট আর শেষবারের লড়াই

ফর্ম খুব ভালো না থাকলেও বিকল্পের অভাবে সিরিজ শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার মূল ওপেনার ছিলেন খাজা। কিন্তু পিঠের চোটে প্রথম টেস্টে ওপেন করতে পারেননি। পরের টেস্টগুলোয় সেই চোটই তাকে বাইরে রাখে।

এই সুযোগে ওপেনিংয়ে নেমে দুই টেস্টেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন ট্রাভিস হেড। অভিষেক সিরিজেই সম্ভাবনার জানান দেন জেইক ওয়েদেরল্ড। অ্যাডিলেইড টেস্টের স্কোয়াডে ফিরলেও একাদশে জায়গা পাননি খাজা।

তবে ম্যাচের সকালে স্টিভেন স্মিথ অসুস্থ হয়ে ছিটকে পড়লে শেষ মুহূর্তে সুযোগ আসে। মিডল অর্ডারে নেমে খেলেন ৮২ ও ৪০ রানের দুটি ইনিংস। তাতে আবার আলোচনায় ফিরে আসে তার নাম।

কিন্তু এবার আর টিকে থাকার যুদ্ধ নয়—নিজের ইচ্ছাতেই বিদায়।

“আমি খুশি যে কিছুটা মর্যাদা নিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে বিদায় নিতে পারছি। সিডনিতে শেষ করতে পারছি—যে মাঠকে আমি ভালোবাসি। অ্যাডিলেইডে স্কোয়াডে ফেরা, কিন্তু একাদশে জায়গা না পাওয়া—ওটাই ছিল আমার জন্য ইঙ্গিত, সামনে তাকানোর সময় হয়েছে।”

প্রশ্ন, চাপ আর আড়ালের গল্প

এই বছরের শুরুতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গলে ২৩২ রানের ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস খেলেছিলেন খাজা। কিন্তু ওই ইনিংস বাদ দিলে অ্যাডিলেইড টেস্টের আগ পর্যন্ত বছরের অন্য ১৩ ইনিংসে ছিল না কোনো ফিফটি। ফলে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার।

সে প্রসঙ্গে খাজা বলেন, “আমি কোচকে বলেছিলাম, যদি কখনো মনে হয় আমি বোঝা হয়ে যাচ্ছি, সরাসরি জানাবেন। আমি ঝুলে থাকব না। সবচেয়ে কষ্টের ছিল এই ধারণা যে, মানুষ ভাবছে আমি স্বার্থপর হয়ে দলে আছি। অথচ আমি নিজে থেকে থাকিনি।”

“অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড স্পষ্টই বলেছিলেন, ‘না, আমরা চাই তুমি থাকো। শ্রীলঙ্কা সফর ও বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে তোমাকে দরকার।’ আমি সেটাই করেছি।”

ইসলামাবাদ থেকে সিডনি—এক ব্যতিক্রমী যাত্রা

খাজার জন্ম পাকিস্তানের ইসলামাবাদে। চার বছর বয়সে বাবা তারিক খাওয়াজা ও মা ফৌজিয়া খাজার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের পাশের কুক রোডেই বেড়ে ওঠা।

ক্রিকেটের পাশাপাশি তার বড় আগ্রহ ছিল বিমান চালনায়। পড়াশোনা করেছেন এভিয়েশন নিয়ে, সনদপ্রাপ্ত পাইলটও তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটকেই বেছে নেন—এবং প্রমাণ করেন, সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল না।

লড়াইয়ে ভরা টেস্ট ক্যারিয়ার

২০১১ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম মুসলিম ক্রিকেটার হিসেবে টেস্ট অভিষেক খাজার। সেই সিডনি টেস্টেই অ্যাশেজ হারে অস্ট্রেলিয়া। চোট পাওয়া রিকি পন্টিংয়ের বদলি হিসেবে সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।

প্রথম ছয় টেস্টে একটি মাত্র ফিফটি—এরপর বাদ। ২০১৩ অ্যাশেজে ফেরেন, আবার বাদ। ঘরোয়া ক্রিকেটে রানের পাহাড় গড়ে ২০১৫ সালে ফেরেন দুর্দান্তভাবে। ব্রিজবেনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে করেন ১৭৪। এরপর পার্থে সেঞ্চুরি, মেলবোর্নে টানা তৃতীয় শতক।

২০১৯ অ্যাশেজে আবার বাদ পড়া। বয়স তখন ৩৩। অনেকেই শেষ দেখে ফেলেছিলেন। কিন্তু ২০২২ সালে সিডনিতে ফিরে দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করে শুরু করেন ক্যারিয়ারের সেরা অধ্যায়।

পাকিস্তান সফরে তিন টেস্টে ৪৯৬ রান করে হন সিরিজসেরা। ওপেনার হিসেবেই গড়ে ওঠে তার নতুন পরিচয়।

সংখ্যায় খাজা

টেস্ট: ৮৮ ম্যাচ, রান: ৬,২০৪, গড়: ৪৩.৩৯, সেঞ্চুরি: ১৬ এবং ফিফটি: ২৮।

৩৫ বছর বয়স পেরোনোর পর করেছেন ৩,৩১৯ রান—টেস্ট ইতিহাসে তার ওপরে আছেন মাত্র ছয়জন।

ওয়ানডেতে ৪০ ম্যাচে ১,৫৫৪ রান (গড় ৪২), খেলেছেন ২০১৯ বিশ্বকাপের সব ম্যাচ। টি-টোয়েন্টি খেলেছেন ৯টি।

কৃতজ্ঞতা ও বিদায়

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী টড গ্রিনবার্গ বলেন, “অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে উসমান খাজা মাঠে ও মাঠের বাইরে অসাধারণ অবদান রেখেছে। তার অর্জনের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।”

রোববার শুরু হচ্ছে সিডনি টেস্ট। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটাই খাওয়াজার শেষ অধ্যায়। তবে আপাতত বিগ ব্যাশ ও শেফিল্ড শিল্ডে খেলা চালিয়ে যেতে চান তিনি।

একজন ক্রিকেটারের গল্পে সবসময় রেকর্ডই শেষ কথা নয়। কখনো কখনো লড়াই, ফিরে আসা আর নিজের শর্তে বিদায়—সেটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় অর্জন। উসমান খাজার গল্প ঠিক তেমনই।