বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রতিটি আসর শুরু হওয়ার আগেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে অবধারিতভাবে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—এবার কি হেক্সা মিশন পূর্ণ করতে পারবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল? ২০০২ সালে জাপানের মাটিতে শেষবার ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পর দীর্ঘ ২৪ বছর কেটে গেলেও সেই অধরা স্বপ্ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। আগামী ২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে সেলেসাওদের নিয়ে ফুটবল বিশ্বের উন্মাদনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই এক জার্মান অর্থনীতিবিদের গাণিতিক সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়েছে ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের সব হিসাব-নিকাশ।
জার্মান বিনিয়োগ বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ ইওয়াখিম ক্লেমেন্টের তৈরি বিশেষ একটি গাণিতিক মডেল ও অ্যালগরিদম দাবি করছে, এবার গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার করলেও নকআউট পর্বের শুরুতেই, অর্থাৎ ‘রাউন্ড অব ৩২’ থেকেই বিদায় নিতে হবে সাম্বা বয়দের। শুধু তাই নয়, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ট্র্যাজিক দল হিসেবে পরিচিত ও ‘চোকার্স’ খ্যাত নেদারল্যান্ডস এবার সব রেকর্ড ভেঙে প্রথমবারের মতো ঘরে তুলবে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি।
ক্লেমেন্টের ভবিষ্যদ্বাণীর অবিশ্বাস্য অতীত রেকর্ড
ইওয়াখিম ক্লেমেন্টের এই গাণিতিক গণনাকে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এর আগে টানা তিনটি বিশ্বকাপে তাঁর করা নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী শতভাগ সত্য প্রমাণিত হয়েছে! ২০১৪ সালে তিনি আগেই জানিয়েছিলেন জার্মানি বিশ্বসেরা হবে, ২০১৮ সালে তাঁর মডেলে উঠে আসে ফ্রান্সের নাম এবং সর্বশেষ ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের সমীকরণও তিনি হুবহু মিলিয়ে দিয়েছিলেন।
টানা তিনবার শতভাগ সফলতার পর এবার ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য তাঁর সেই বিশেষ অ্যালগরিদম বেছে নিয়েছে ডাচ বাহিনীকে।
ক্লেমেন্টের এই মডেল অনুযায়ী, বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে নেদারল্যান্ডস এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। সেখানে পর্তুগিজদের হারিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে ডাচরা।
আরও পড়ুন:
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ নেইমার, রহস্যময় ছক বানাচ্ছেন আনচেলত্তি
যে ৫ নিয়ামকের ওপর তৈরি হয়েছে এই ফর্মুলা
খেলার মাঠে বল গড়ানোর আগেই কীভাবে একজন অর্থনীতিবিদ নিখুঁতভাবে চ্যাম্পিয়ন দল নির্ধারণ করে ফেলেন, তা নিয়ে গভীর কৌতুহল রয়েছে।
ক্লেমেন্ট মূলত তাঁর তৈরি বিশেষ ইকোনোমেট্রিক মডেলে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বা নিয়ামক ব্যবহার করেন। এগুলো হলো—সংশ্লিষ্ট দেশের মাথাপিছু জিডিপি, মোট জনসংখ্যা, দেশের আবহাওয়া, বর্তমান ফিফা র্যাংকিং এবং স্বাগতিক দেশের সুবিধা (হোম অ্যাডভান্টেজ)।
এই মডেলে দেখা হয়, একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন, যা মূলত ফুটবল অবকাঠামো ও উন্নত একাডেমি তৈরিতে বিনিয়োগে সাহায্য করে। আবার ফুটবল সংস্কৃতির পাশাপাশি জনসংখ্যা বেশি হলে সেখান থেকে নতুন প্রতিভা খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আবহাওয়ার ক্ষেত্রে দেখা হয় দেশের গড় তাপমাত্রা অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম কি না, যা খেলোয়াড়দের শারীরিক গঠনে প্রভাব ফেলে।
এছাড়া দলের বর্তমান ফর্ম বুঝতে ফিফা র্যাংকিং এবং ঘরের মাঠে গ্যালারিভর্তি দর্শকের গগনবিদারী সমর্থনের বিষয়টিও এই হিসাবে যুক্ত করা হয়।
ব্রাজিলের বিদায় ও ডাচদের কঠিন সমীকরণ
ক্লেমেন্টের এই সিমুলেশন অনুযায়ী, ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের অপেক্ষা এবার আরও দীর্ঘ হতে চলেছে। দ্বিতীয় রাউন্ডের নকআউট পর্বের কঠিন কোনো প্রতিপক্ষের সামনে পড়ে শুরুতেই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাবে সেলেসাওরা। তবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে নেদারল্যান্ডসের যাত্রাও সহজ হবে না। ডাচদের ট্রফি ছুঁতে হলে নকআউট পর্বে একে একে মরক্কো, কানাডা এবং কোয়ার্টার ফাইনালে পরাশক্তি ফ্রান্সকে হারাতে হবে।
এরপর সেমিফাইনালে স্পেনের কঠিন বাধা টপকে তবেই ফাইনালে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালের মুখোমুখি হবে তারা।
ব্রাজিলের জন্য আশার কথা
অবশ্য এখনই ব্রাজিল ভক্তদের পুরোপুরি আশাহত হতে বারণ করেছেন খোদ ক্লেমেন্ট।
তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ফুটবলে সব সময় গাণিতিক হিসাব মেলে না, কারণ এখানে ভাগ্যেরও একটা বড় ভূমিকা থাকে। তিনি জানান, এই মডেলে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ নির্ভর করে স্রেফ ওই নির্দিষ্ট দিনের ভাগ্যের ওপর। দুই দলের শক্তি কাছাকাছি হলে ভাগ্যই ম্যাচের গতিপথ ঠিক করে দেয়।
তাই তাঁর কাছে কোনো জাদুকরী ক্রিস্টাল বল নেই বলেই তিনি মন্তব্য করেন।
এখন কেবল মাঠের লড়াই শুরুর অপেক্ষা। ক্লেমেন্টের এই জটিল অ্যালগরিদম কি ‘চারে চার’ করে ফুটবল দুনিয়ায় নিজের রাজত্ব ধরে রাখবে, নাকি মাঠের পারফরম্যান্সে সব ভবিষ্যৎবাণী বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ব্রাজিল ঘুচাবে তাদের দীর্ঘ ২৪ বছরের ট্রফি খরা!
আরও পড়ুন:
৩০ বছর পর ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে যে নজির দেখা গেল

