হারের পর চেলসির প্লেয়ারদের হতাশা।চেলসিতে এখন কেবলই হতাশা। ছবি: রয়টার্স

ফুটবল মাঠে গোল করা যেন এখন চেলসির কাছে এক ‘সোনার হরিণ’। কদিন আগেও যারা লিগ টেবিলের শীর্ষ চারের লড়াইয়ে দাপট দেখাচ্ছিল, সেই দলটিই এখন একটি জয়ের জন্য তীর্থের কাক হয়ে অপেক্ষায় আছে। গোল খরা আর হারের বৃত্তে বন্দি চেলসি গতকাল মঙ্গলবার রাতে ব্রাইটনের মাঠে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে ১১৪ বছরের পুরোনো এক লজ্জার রেকর্ডে নাম লিখিয়েছে। স্টামফোর্ড ব্রিজের ক্লাবটি ১৯১২ সালের পর এই প্রথম লিগে টানা পাঁচ ম্যাচে হারের স্বাদ পেল কোনো গোল না করেই।

ম্যাচ শেষে ব্রাইটনের অ্যামেক্স স্টেডিয়ামে দেখা গেল এক ছন্নছাড়া চেলসির প্রতিচ্ছবি। একদিকে কোচ লিয়াম রোজনিয়র সমর্থকদের দুয়োধ্বনির মুখে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাইছিলেন, অন্যদিকে অধিনায়ক এনজো ফার্নান্দেজকে (Enzo Fernandez) দেখা গেল সমর্থকদের ক্ষোভের মুখে কেবল দায়সারা অঙ্গভঙ্গি করতে।

১ বিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে গড়া এই বিশাল স্কোয়াড এখন কেবল মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও মালিকপক্ষ ‘ব্লু-কো’র (BlueCo) অদূরদর্শী পরিকল্পনার শিকার হয়ে ডুবছে।

পরিসংখ্যানের আয়নায় ঐতিহাসিক পতন

চেলসির এই দুঃসহ যাত্রা শুরু হয়েছিল গত ১৪ মার্চ নিউক্যাসলের বিপক্ষে ১-০ গোলের হার দিয়ে। এরপর একে একে এভারটন, ম্যানচেস্টার সিটি ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে গোলহীন পরাজয় এবং সর্বশেষ ব্রাইটনের কাছে তিন গোল হজম—সব মিলিয়ে ১১৪ বছর আগের সেই দুঃসময়ে ফিরে গেল ‘ব্লুজ’রা। ১৯১২ সালের সেই রেকর্ডের পাশাপাশি ১৯৯৩ সালের পর এই প্রথম লিগে টানা পাঁচ ম্যাচে হারল তারা।

আরও পড়ুন: ধ্বংসের কিনারে চেলসি: ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচটিই শেষ সুযোগ!

চেলসির রক্ষণভাগের দুর্বলতা ফুটে উঠেছে কর্নার থেকে গোল হজমের পরিসংখ্যানে। চলতি মৌসুমে কর্নার থেকেই তারা ১১টি গোল হজম করেছে, যা প্রিমিয়ার লিগে ক্লাবটির এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোল খাওয়ার রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছে (১৯৯৪-৯৫ মৌসুমেও ছিল ১১টি)।

লড়াইহীন ফুটবল ও অগ্রহণযোগ্য পারফরম্যান্স

মাঠে চেলসির খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনো লড়াকু মানসিকতা দেখা যায়নি। ব্রাইটনের বিপক্ষে ম্যাচে প্রথম ট্যাকল করতে চেলসি সময় নিয়েছে ৩২ মিনিট। যেখানে ব্রাইটন চেলসির চেয়ে প্রায় ৭ কিলোমিটার বেশি দৌড়েছে, সেখানে ‘ব্লুজ’ ডিফেন্ডার ট্রেভোহ চালোবাহর ‘সবাই সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছে’ দাবিটি হাস্যকর ঠেকেছে সমর্থকদের কাছে।

ম্যাচ শেষে লিয়াম রোজনিয়র কোনো রাখঢাক না রেখেই বলেন, ‘খেলার প্রতিটি দিক থেকেই এই পারফরম্যান্স অগ্রহণযোগ্য ছিল। যেভাবে আমরা ডুয়েল হেরেছি আর দলের মধ্যে তীব্রতার যে অভাব ছিল, তাতে এখনই বড় পরিবর্তন দরকার।’

মডেল অনুকরণে বড় বিপর্যয়

চেলসির বর্তমান মালিকপক্ষ শুরু থেকেই ব্রাইটনের মডেল অনুকরণ করতে চেয়েছিল। ব্রাইটনের স্পোর্টিং ডিরেক্টর পল উইনস্ট্যানলিকে আনা থেকে শুরু করে গ্রাহাম পটার বা লিয়াম রোজনিয়ারের মতো ব্রাইটন সংশ্লিষ্টদের নিয়োগ দেওয়া—সবই ছিল সেই প্রজেক্টের অংশ।

কিন্তু যাঁর অনুকরণ করতে চেয়েছিল, সেই ব্রাইটনের কাছেই হোম ও অ্যাওয়ে ম্যাচে বিধ্বস্ত হওয়াটা চেলসির জন্য চরম লজ্জার।

লিগ টেবিলের নিচের অর্ধে নেমে যাওয়ার শঙ্কায় থাকা চেলসি এখন এক গভীর সংকটে। রোজনিয়ার পরাজয়ের দায় নিলেও কোচ এবং খেলোয়াড়দের মধ্যকার দূরত্ব এখন স্পষ্ট। ফুটবল বিশ্লেষক টিম শেরউডের মতে, চেলসি এখন কেবলই একটি ‘ডেভেলপমেন্ট ক্লাবে’ পরিণত হয়েছে, যেখানে জয়ের চেয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাই বেশি।

আরও পড়ুন: চেলসি ও স্ট্রাসবার্গের রহস্যময় দলবদল কি মহাবিপর্যয়ের সংকেত?

ভবিষ্যৎ যেখানে অন্ধকার

টানা পাঁচ হারের পর শীর্ষ চারের স্বপ্ন এখন চেলসির জন্য অলীক কল্পনা। ৩৪ ম্যাচে ৪৮ পয়েন্ট নিয়ে সপ্তম স্থানে থাকলেও তাদের নিচে থাকা পাঁচটি দলই এক ম্যাচ কম খেলেছে। ফলে চেলসির অবস্থান দ্রুতই টেবিলের নিচের অর্ধে চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে শেষ ৮ ম্যাচের ৭টিতেই হেরেছে তারা। একমাত্র জয়টি এসেছে তৃতীয় বিভাগের ক্লাব পোর্ট ভ্যালের বিপক্ষে।

বিশাল অর্থ খরচ করে গড়া এই প্রজেক্ট এখন খাদের কিনারায়। সমর্থকদের গ্যালারিতে ‘ব্লু-কো আউট’ ব্যানার আর মাঠের এই জঘন্য পারফরম্যান্স বলে দিচ্ছে—চেলসি কেবল একটি গোল বা জয়ের জন্য নয়, তাদের ঐতিহ্যের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়েও এখন খেই হারিয়েছে।