নিজেদের ‘হ্যাপি স্ল্যাম’ বলে পরিচিত অস্ট্রেলিয়ান ওপেন। তবে বাস্তবতা ছিল কিছুটা ভিন্ন। চলতি আসরের বড় একটি সময়জুড়ে দুরন্ত লড়াইয়ের ম্যাচ ও নাটকীয় মুহূর্তের অভাবে হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকেই। মেলবোর্নের এবারের টুর্নামেন্টকে কেউ কেউ বলছিলেন নিষ্প্রাণ।
তবে ১৩তম দিনে এসে বদলে গেল দৃশ্যপট। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে আগুন জ্বালাল বছরের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম।
শুক্রবার প্রথম পুরুষ একক সেমিফাইনালে আলেক্সান্ডার জভেরেভকে হারাতে কার্লোস আলকারাজ যে অবিশ্বাস্য লড়াই উপহার দেন, সেটিই দিনের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠবে—এমনটাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু নোভাক জোকোভিচ যে কখনোই পার্শ্বচরিত্রে থাকতে পছন্দ করেন না, সেটাই আবার প্রমাণ করলেন।
৩৮ বছর বয়সী এই সার্বিয়ান তারকা ক্যারিয়ারের অন্যতম বিস্ময়কর জয় তুলে নেন ইয়ানিক সিনারের বিপক্ষে। এত অর্জনের ভিড়েও এই জয় আলাদা করে নজর কাড়ে। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে সিনারকে হারিয়ে পুরো আসরের আলো নিজের দিকে টেনে নেন জোকোভিচ।
ডজোকোভিচের রসিকতা, দর্শকের উচ্ছ্বাস
কী দুর্ধর্ষ এক লড়াই-ই না হলো! প্রায় সাড়ে ৫ ঘন্টার মহাকাব্যিক যুদ্ধ! অস্ট্রেলিয়া ওপেনের টানা দুইবারের চ্যাম্পিয়ন ইয়ানিক সিনার। তাঁর বিপক্ষে লড়াইটা সহজ হবে না মোটেও, তা জোকোভিচের অজানা ছিল না। প্রথম সেটে ৩-৬ গেমে পিছিয়ে পরেরটিতে ৬-৩ গেমে ফিরে আসেন। এরপর ম্যাচ ৪-৬ ও ৬-৪ গেমের দুই সেটে দুলতে থাকে অনিশ্চয়তায়। শেষ সেটে দুর্দান্ত দৃঢ়তা দেখিয়ে ৬-৪ গেমে জিতে নেন জোকোভিচ।
ম্যাচ শেষে মেলবোর্নের দর্শকদের উদ্দেশে জোকোভিচ বলেন, “আমি আলকারাজ–জভেরেভ ম্যাচটা দেখেছি, কী অবিশ্বাস্য লড়াই। আমরা চেষ্টা করেছি সেই তীব্রতা ধরে রাখতে। আমার মনে হয়, আপনারা টিকিটের পুরো মূল্য পেয়েছেন। আজকের টিকিট বিক্রির ১০ শতাংশ কিন্তু আমি চাই!”
এই জয়ের মাধ্যমে জোকোভিচ এককভাবে ২৫তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপার স্বপ্নও বাঁচিয়ে রাখলেন।

দ্বিতীয় সপ্তাহের নির্জীবতা ভাঙল
অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের দ্বিতীয় সপ্তাহজুড়ে উত্তেজনার ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। পুরুষ ও নারী এককে শীর্ষ বাছাইরা বেশির ভাগ ম্যাচই জিতেছেন সোজাসাপ্টা সেটে। শেষ ষোলোর পর থেকে দুই ড্র মিলিয়ে পাঁচ সেটে গড়ানো ম্যাচ ছিল হাতে গোনা।
জভেরেভের বিপক্ষে আলকারাজের জয় ছিল সেই পর্যায়ে চতুর্থ ম্যাচ, যা গড়ায় পাঁচ সেটে। কিছুক্ষণ পরই সেটিকে ছাপিয়ে যায় আরেকটি নাটকীয় লড়াই। জোকোভিচ–সিনার ম্যাচ শেষে রাত দেড়টায় মেলবোর্ন পার্কজুড়ে সার্বিয়ান সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
বাইরে বড় পর্দায় ম্যাচ দেখা ২৭ বছর বয়সী সাশা স্তানিসিচ বলেন, “আমি যখন নয় বছর বয়সী, তখন এখানে প্রথম নোভাককে খেলতে দেখি। আজকের অনুভূতিটা অবিশ্বাস্য। আমার কাছে এটা তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অর্জন—২০১৯ উইম্বলডন ফাইনালের ঠিক পরেই।”
ফাইনালের সমীকরণ
ডজোকোভিচের এই জয়ে আলকারাজ ও সিনারের আরেকটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনালের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। অনেকেই আশা করেছিলেন, টানা চতুর্থবারের মতো এই দুই তারকাকে শিরোপা লড়াইয়ে দেখা যাবে।
এর বদলে, অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ফাইনালে তৃতীয়বারের মতো মুখোমুখি হচ্ছেন জোকোভিচ ও আলকারাজ। এর আগে ২০২৩ ও ২০২৪ উইম্বলডনের ফাইনালে লড়েছিলেন তারা।
এর আগে শনিবার নারী এককের ফাইনালে মুখোমুখি হবেন আরিনা সাবালেঙ্কা ও এলেনা রাইবাকিনা। ডব্লিউটিএ ট্যুরের দুই শক্তিশালী খেলোয়াড়ের এই দ্বৈরথও ব্লকবাস্টার হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠা অস্ট্রেলিয়ান ওপেন শেষটা করতে যাচ্ছে জমজমাটভাবেই—বলা যায়, দেরিতে হলেও ঠিকই আগুন ধরেছে।
বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভে সাবেক ব্রিটিশ নাম্বার ওয়ান অ্যানাবেল ক্রফট বলেন, “এই টুর্নামেন্টটা আসলে জ্বলে ওঠেনি। আজকের দুটি মহাকাব্যিক ম্যাচই ছিল পুরো পনেরো দিনে আমরা যার অপেক্ষায় ছিলাম।”

