আইপিএল থেকে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপের মুখে একজন ক্রিকেটারকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে দুই দেশের ক্রীড়াসম্পর্কে।
মঙ্গলবার জম্মুতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওমর আবদুল্লাহ বলেন, এই সিদ্ধান্ত শুধু একজন খেলোয়াড়ের পেশাগত ভবিষ্যৎকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেনি, বরং বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কেও অপ্রয়োজনীয় টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে।
কী ঘটেছিল মোস্তাফিজকে নিয়ে
উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হুমকির মুখে গত ৩ জানুয়ারি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্সকে (কেকেআর) মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। নির্দেশ পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় কেকেআর।
এই সিদ্ধান্ত ঘিরে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে, বড় মাপের টুর্নামেন্টে পুরো দল কতটা নিরাপদ থাকবে—এমন প্রশ্ন তুলে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
‘বাংলাদেশ আমাদের কী ক্ষতি করেছে?’
টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলে ওমর আবদুল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বেচারা খেলোয়াড়টার দোষ কী? আমি মানি, পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুবই খারাপ; কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ আমাদের কী ক্ষতি করেছে?”
“বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো ছিল। এখনো ভালো আছে। বাংলাদেশ আমাদের দেশে কোনো সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত নয়, আমাদের কোনো ক্ষতিও করেনি। আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।”
বিশ্বকাপ নিয়েও উদ্বেগ
মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার প্রভাব যে শুধু আইপিএলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, সেটিও তুলে ধরেন জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী।
বাংলাদেশের বিশ্বকাপে খেলতে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একজন খেলোয়াড়কে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে বিশ্বকাপ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশিরা বলছে, তারা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে আসবে না। তারা চায় তাদের ম্যাচ অন্য কোথাও হোক।”
বাংলাদেশ সরকার নয়, খেলোয়াড় কেন?
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন তুললে, আবদুল্লাহ স্পষ্ট করে বলেন, সমস্যার সমাধান খেলোয়াড়দের দিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হওয়া উচিত।
এই প্রসঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাম্প্রতিক ঘটনার উদাহরণ টানেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের প্রসঙ্গ এনে বলেন, ‘মিস্টার ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যা করেছেন, বাংলাদেশেও তা করে দেখান—যদি সেটাই করতে চান। এই খেলোয়াড়ের দোষ কী? সে খেলতে প্রস্তুত ছিল। তার দল তাকে সরাতে চায়নি। তাদের (কেকেআরের) বিবৃতি পড়ুন।”
“ওপর থেকে চাপ ছিল বলেই জোর করে তাকে ফেরত পাঠাতে হয়েছে। খেলোয়াড় নিজেও ফিরতে চায়নি, তার দলও তাকে ফেরত পাঠাতে চায়নি। ওপর মহল থেকে চাপ ছিল।”
খেলাধুলায় রাজনীতির অভিযোগ
সাম্প্রতিক সময়ে সন্তোষ ট্রফিতে জম্মু ও কাশ্মীর দলের খেলোয়াড় নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক চলছে। এ প্রসঙ্গে বিজেপি নেতাদের একহাত নেন আবদুল্লাহ।
তিনি বলেন, “আমরা খেলাকে খেলা হিসেবে দেখি। যারা খেলাকে রাজনীতির সঙ্গে জড়ায়, তাদের জিজ্ঞেস করুন। তারা যখন দল দেখে, তখন খেলোয়াড়দের ধর্ম দেখে। তারা ধর্ম ছাড়া আর কিছুই দেখে না। ফুটবল দলে মুসলমান বেশি থাকলে তাদের আপত্তি থাকে। ক্রিকেট দলে মুসলমান কম থাকলে তাদের কোনো আপত্তি থাকে না। তারা শিক্ষা, খেলাধুলা সবকিছুতেই ধর্ম খোঁজে।”
বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
মোস্তাফিজ ইস্যু ঘিরে ওমর আবদুল্লাহর এই মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া সংকট কি কেবল খেলাধুলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে?

