লিটন-তাসকিনদের জন্য আড়াই কোটি টাকার টুর্নামেন্ট আনল বিসিবি

বিপিএলের ঢাকার শেষ পর্ব মাঠের খেলার চেয়ে মাঠের বাইরের ঘটনাতেই বেশি আলোচনায়। কয়েক দিনের ব্যবধানে একের পর এক ঘটনায় দেশের ক্রিকেটে তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর পরিবেশ। সেই উত্তাপের মধ্যেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আদৌ কি অংশ নেবে বাংলাদেশ?

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সামনে রেখে বাংলাদেশের ক্রিকেটে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সূত্রপাত সাম্প্রতিক কোনো ব্যক্তিগত মন্তব্যে নয়—বরং ঘটনাপ্রবাহের শিকড় বেশ গভীরে।

সবকিছুর শুরু আইপিএলকে ঘিরে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপের মুখে বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স স্কোয়াড থেকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় প্রথম ধাক্কা লাগে ক্রিকেটাঙ্গনে। বিষয়টি শুধু একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি দ্রুত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত আলোচনায় রূপ নেয়।

এই প্রসঙ্গেই প্রকাশ্যে কথা বলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল। মোস্তাফিজের সঙ্গে হওয়া আচরণ নিয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। বিশ্বকাপে খেলতে ভারতে যাওয়ার প্রসঙ্গটিও ওঠে আসে তাতে। সেটিই পরে বিসিবির ভেতরের অস্বস্তিকে সামনে এনে দেয়।

তামিমের সেই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিসিবির পরিচালক নাজমুল ইসলাম প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন। শুরুতে সেটি তামিমকেন্দ্রিক থাকলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়, যখন নাজমুল ইসলাম ক্রিকেটারদের আর্থিক বিষয় ও বোর্ডের দায় নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন।

সেই মন্তব্যই আগুনে ঘি ঢালে। ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব নাজমুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি করে এবং প্রতিবাদ হিসেবে বিপিএল বয়কটের ঘোষণা দেয়। এর জেরে একদিন বন্ধ থাকে বিপিএলের খেলা, পরে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতও ঘোষণা করা হয় টুর্নামেন্ট।

চাপের মুখে বিসিবি নাজমুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় এবং তিনি যে স্ট্যান্ডিং কমিটির অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন, সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। ১৫ জানুয়ারি রাতে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর শর্তসাপেক্ষে মাঠে ফেরেন ক্রিকেটাররা। এরপর আবার শুরু হয় বিপিএল।

কিন্তু মাঠে খেলা ফিরলেও মাঠের বাইরের উত্তেজনা কমেনি। এর মধ্যেই ঢাকায় আসে আইসিসির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের জেনারেল ম্যানেজার অ্যান্ড্রু এফগ্রেভ সশরীরে এবং ইভেন্টস অ্যান্ড কর্পোরেট কমিউনিকেশন্স বিভাগের প্রধান গৌরব সাক্সেনা অনলাইনে বিসিবির সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন।

বৈঠকে বিসিবি আবারও জানিয়ে দেয়—ভারতে গিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলবে না বাংলাদেশ। নিরাপত্তা, খেলোয়াড়, সমর্থক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টি তুলে ধরে শ্রীলঙ্কাকে বিকল্প ভেন্যু হিসেবে প্রস্তাব করা হয়। প্রয়োজনে গ্রুপ পরিবর্তনের কথাও আলোচনায় আসে।

তবে বৈঠক শেষে কেউই মুখ খোলেননি। বিসিবির প্রেস রিলিজে আলোচনাকে ‘গঠনমূলক’ বলা হলেও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা আশ্বাসের কথা উল্লেখ করা হয়নি। আইসিসির প্রতিনিধিরা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ভারতেই খেলতে যাওয়ার যুক্তি তুলে ধরেছেন—এমন ইঙ্গিতই মিলেছে।

এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশের অবস্থান বদলায়নি, আবার আইসিসিও বিকল্প ভেন্যুতে সবুজ সংকেত দেয়নি। বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে নারাজ।

বিসিবির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, শ্রীলঙ্কায় গিয়ে বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা এখন বাস্তবতার বিচারে খুবই ক্ষীণ। গ্রুপ পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হলে একাধিক দেশের বোর্ডের সম্মতি প্রয়োজন, যা সহজ নয়।

এখন বিসিবির তাকিয়ে থাকা একমাত্র ব্যক্তি আইসিসি প্রেসিডেন্ট জয় শাহ। তাঁর সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া পুরো প্রক্রিয়ায় বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন না বোর্ডের কর্মকর্তারাই।

তবে জয় শাহের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়েও আছে প্রশ্ন। তিনি ভারতের শাসক দলের আস্থাভাজন, ঘনিষ্ঠ। দেশটির প্রভাবশালী এক নেতার ছেলে। ফলে তার সিদ্ধান্ত মূলত যে আইসিসিকেন্দ্রিক হবে না, তা স্পষ্ট। এখানে ভারত সরকারের ইশারাও থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সব মিলিয়ে, মোস্তাফিজ ইস্যু থেকে শুরু হওয়া ঘটনাপ্রবাহ এখন এসে ঠেকেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নে—টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কি আদৌ মাঠে নামবে বাংলাদেশ?