ফুটবল বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ক্রীড়াপ্রেমীর জন্য নিয়ে আসে উন্মাদনা আর রোমাঞ্চ। মাঠের লড়াইয়ে ফেভারিটদের গোলবন্যা, তারকাদের চোখ ধাঁধানো ড্রিবলিং আর ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন—এসব ঘিরেই আবর্তিত হয় ফুটবল মহাযজ্ঞ। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই মঞ্চটি শুধুমাত্র ফেভারিটদের রাজত্বের গল্পই বলে না; এটি বিখ্যাত হয়ে আছে এমন কিছু অভাবনীয় ও অবিস্মরণীয় মুহূর্তের জন্য, যা ফুটবল দুনিয়াকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। শক্তিশালী পরাশক্তিদের বুক চিরে আন্ডারডগ বা ছোট দলগুলোর বুক চিতিয়ে লড়াইয়ের এই গল্পগুলোই ‘বিশ্বকাপের বড় অঘটন’। কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সৌদি আরবের অবিশ্বাস্য জয়টি যেমন গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তেমনি ইতিহাসের পাতায় রয়েছে এমন আরও কিছু অবিশ্বাস্য ধাক্কা।
বিশ্বকাপের ইতিহাসের এমনই ১০টি বড় ট্র্যাজেডি ও রূপকথার গল্প নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজন।
১. আমেরিকা ১-০ ইংল্যান্ড (১৯৫০ বিশ্বকাপ)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ড দল যখন প্রথমবার ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিতে আসে, তখন তাদের দলে ছিলেন আলফ রামসে, টম ফিনির মতো কিংবদন্তিরা। অন্যপক্ষে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দলটি গঠিত হয়েছিল থালাবাসন ধোয়ার কর্মী, ডাকপিয়ন আর স্কুলের খণ্ডকালীন শিক্ষকদের নিয়ে। এই দলটির একসঙ্গে মাত্র একদিন অনুশীলনের সুযোগ হয়েছিল এবং জাহাজে চড়ে তারা ব্রাজিলে পৌঁছায়। ম্যাচের ৩৮ মিনিটে জো গ্যাটজেন্সের করা হেডে এগিয়ে যায় আমেরিকা। দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ডের একের পর এক আক্রমণ বুক চিতিয়ে রুখে দেন মার্কিন গোলরক্ষক ফ্রাঙ্ক বোরগি।
শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়ে ইতিহাস লিখেছিল অপেশাদারদের সেই আমেরিকা।
আরও পড়ুন:
বিশ্বকাপের স্পটলাইটে ফুটবলের ৫ মহাতারকা
২. পশ্চিম জার্মানি ৩-২ হাঙ্গেরি (১৯৫৪ বিশ্বকাপ)
বর্তমান ফুটবলে জার্মানির কামব্যাক বা ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জেতার ঘটনা ডালভাত হলেও ১৯৫০-এর দশকে চিত্রটি এমন ছিল না।
তখন বিশ্ব ফুটবল শাসন করছিল ফেরেনক পুসকাসের নেতৃত্বাধীন হাঙ্গেরির ‘মাইটি ম্যাগিয়ার্স’ দল। সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে ফেভারিট হিসেবে খেলতে এসে হাঙ্গেরি গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ কোরিয়াকে ৯-০ এবং এই পশ্চিম জার্মানিকেই ৮-৩ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল। ফাইনালে যখন এই দুই দল আবার মুখোমুখি হয়, ম্যাচের প্রথমার্ধেই হাঙ্গেরি ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে শিরোপার সুবাস পাচ্ছিল। কিন্তু রূপকথার মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে জার্মানি দুটি গোল শোধ করে। এরপর ৮৪ মিনিটে হেলমুট রান নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে হাঙ্গেরিয়ানদের হৃদয় ভেঙে দেন।
ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা দলের বিরুদ্ধে জার্মানির এই মহাকাব্যিক জয়টি ফুটবল ইতিহাসে ‘দ্য মিরাকল অফ বার্ন’ বা বার্নের অলৌকিক ঘটনা নামে অমর হয়ে আছে।
৩. উত্তর কোরিয়া ১-০ ইতালি (১৯৬৬ বিশ্বকাপ)
শীতল যুদ্ধের উত্তেজনার মাঝে সে বছর উত্তর কোরিয়ার খেলোয়াড়দের ইংল্যান্ডের ভিসা পাওয়া নিয়েই জলঘোলা কম হয়নি।
তবে মাঠের লড়াইয়ে তারা যে রূপকথা লিখবে, তা কেউ ভাবেনি। ম্যাচের একপর্যায়ে ইতালির মিডফিল্ডার জাকোমো বুলগারেয়ি চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন। সেই সময়ে ফুটবলার বদলির (Substitution) নিয়ম না থাকায় ইতালি পরিণত হয় ১০ জনের দলে। এই সুযোগের ঠিক সাত মিনিট পর উত্তর কোরিয়ার পাক দু ইক এমন এক গোল করেন, যা কেবল ম্যাচই জেতায়নি, দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দিয়েছিল।

ম্যাচটির টিকিট আজও ফিফা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। যে স্টেডিয়ামে এই ইতিহাস তৈরি হয়েছিল, তা ভেঙে আবাসন প্রকল্প করা হলেও গোলপোস্টের সেই নির্দিষ্ট স্থানটি আজও লোহার স্টাড দিয়ে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে।
৪. আলজেরিয়া ২-১ পশ্চিম জার্মানি (১৯৮২ বিশ্বকাপ)
তৎকালীন ইউরো চ্যাম্পিয়ন ও দুইবারের বিশ্বসেরা পশ্চিম জার্মানি ১৯৮২ বিশ্বকাপে খেলতে এসেছিল কার্ল-হাইঞ্জ রুমেনিগে, লোথার ম্যাথাউস ওলফগ্যাং ড্রেমলারের মতো তারকাখচিত দল নিয়ে। অন্যদিকে, আলজেরিয়া দলটি ছিল প্রায় অপরিচিত ফুটবলারদের নিয়ে গড়া। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের খেসারত দিয়ে ৫৪ মিনিটে প্রথম গোল হজম করে বসে জার্মানি।
লিজেন্ডারি রুমেনিগোর গোলে জার্মানি সমতায় ফিরলেও তার ঠিক পরেই আলজেরিয়ান ফরোয়ার্ড লাখদার বেলৌমি এমন এক জাদুকরী গোল করেন, যা পুরো ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়।
আরও পড়ুন:
২০৩০ বিশ্বকাপে ৬৬ দলের মহাধামাকা?
৫. ক্যামেরুন ১-০ আর্জেন্টিনা (১৯৯০ বিশ্বকাপ)
ডিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ও হট ফেভারিট হিসেবে ১৯৯০ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মাঠে নেমেছিল আর্জেন্টিনা।
অন্যদিকে, ক্যামেরুন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে এবং সেবার সাব-সাহারান আফ্রিকার একমাত্র প্রতিনিধি ছিল তারা। ঐতিহাসিক সান সিরো স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণ রুখে দিয়ে ক্যামেরুনের ডিফেন্ডাররা আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নেয়। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের মাঝপথে এক ফ্রি-কিক থেকে উড়ে আসা বলে চোখ ধাঁধানো হেডে গোল করেন ফ্রাঁসোয়া ওমাম-বিয়িক।
ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে আফ্রিকান ফুটবলের নতুন সূর্যোদয়ের বার্তা দেয় ক্যামেরুন।
৬. ফ্রান্স ০-১ সেনেগাল (২০০২ বিশ্বকাপ)
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বনাম টুর্নামেন্টের নবাগত দল; সাবেক উপনিবেশবাদী দেশ বনাম স্বাধীন হওয়া এক উপনিবেশ দেশ—২০০২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের আবহ ছিল এমনই রোমাঞ্চকর। তবে ফরাসি পরাশক্তিরা চিন্তাই করতে পারেনি যে সেনেগাল তাদের আক্রমণভাগকে এভাবে বোতলবন্দী করে ফেলবে। এল হাদজি দিউফের গতি এবং ম্যাচের ৩০ মিনিটে পাপা বুবা দিওপের করা সেই ঐতিহাসিক গোলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে দেয় সেনেগাল। গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচগুলোতেও ব্যর্থ হয়ে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় ফ্রান্স, আর সেনেগাল আফ্রিকার দ্বিতীয় দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখে।
৭. জার্মানি ৭-১ ব্রাজিল (২০১৪ বিশ্বকাপ)
১৯৫০ সালে ঘরের মাঠে উরুগুয়ের কাছে ট্রফি হারানোর ক্ষতটা ঘরের মাঠেই মুছতে চেয়েছিল ব্রাজিল। পুরো সাম্বা জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল তাদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরার জন্য। সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল জার্মানি। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে চোটের কারণে দলের সেরা তারকা নেইমার জুনিয়র এবং কার্ড সমস্যার কারণে অধিনায়ক থিয়াগো সিলভাকে হারায় সেলেসাওরা। মিনেইরাও স্টেডিয়ামে ম্যাচের ১১ মিনিটে গোল উৎসবের খাতা খোলে জার্মানি। এরপর ২৩ থেকে ২৯ মিনিটের মধ্যে মাত্র ৬ মিনিটে আরও ৪টি গোল করে স্তব্ধ করে দেয় মাঠের গ্যালারি থেকে শুরু করে পুরো ব্রাজিলকে। বিরতির পর জার্মানি আরও দুবার ব্রাজিলের রক্ষণভাগ গুঁড়িয়ে দেয়। শেষ মিনিটে ব্রাজিলের সান্ত্বনাসূচক গোলটি হারের ব্যবধান কমানো ছাড়া কোনো কাজে আসেনি।

১-৭ গোলের এই লজ্জাজনক হারটি ছিল ১৯২০ সালের পর ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় পরাজয়, যা ফুটবল ইতিহাসে ‘দ্য অ্যাগনি অফ মিনেইরাও’ বা ‘মিনেইরাওর ট্র্যাজেডি’ নামে কুখ্যাত।
৮. নেদারল্যান্ডস ৫-১ স্পেন (২০১৪ বিশ্বকাপ)
২০১৪ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শুরুতেই মুখোমুখি হয়েছিল গত বিশ্বকাপের দুই ফাইনালিস্ট স্পেন ও নেদারল্যান্ডস।
বর্তমান বিশ্ব ও ইউরো চ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্প্যানিশরা ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নেমেছিল। ম্যাচের ২৭ মিনিটে জাবি আলোনসোর পেনাল্টি গোলে স্পেন এগিয়ে যাওয়ার পর সব ঠিকঠাকই মনে হচ্ছিল। কিন্তু প্রথমার্ধ শেষের ঠিক এক মিনিট আগে রবিন ভ্যান পার্সি গোলপোস্ট থেকে ১৫ গজ দূর থেকে বাতাসে ভেসে আসা বলে ডাইভ দিয়ে এক অসামান্য হেড করেন, যা বোকা বানিয়ে দেয় গোলরক্ষক ইকার ক্যাসিয়াসকে। এই ফ্লাইং ডাচম্যানের গোলের পর দ্বিতীয়ার্ধে স্পেনের ওপর টর্নেডো চালায় ডাচরা। আরও ৪টি গোল করে স্পেনকে ৫-১ ব্যবধানে বিধ্বস্ত করে তারা।
এটি ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হারের রেকর্ড। এই ধাক্কায় স্পেন গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।
৯. দক্ষিণ কোরিয়া ২-০ জার্মানি (২০১৮ বিশ্বকাপ)
টানা তিন বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার অভিশাপের তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছিল জার্মানি।
শেষ ম্যাচে নকআউটে যাওয়ার জন্য জার্মানির দরকার ছিল জয়, আর দক্ষিণ কোরিয়া খেলছিল স্রেফ নিজেদের সম্মান বাঁচানোর তাগিদে। ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে কর্নার থেকে গোল করে কোরিয়াকে এগিয়ে নেন কিম ইয়ং-গুন। গোল শোধ করতে মরিয়া জার্মান গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যার গোলপোস্ট ছেড়ে কোরিয়ার ডি-বক্সে চলে আসেন। এই সুযোগে ফাঁকা মাঠ পেয়ে কোরিয়ান খেলোয়াড়রা বল কেড়ে নিয়ে শূন্য পোস্টে বল জড়িয়ে জার্মানির বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়।
১৯৩৮ সালের পর এটিই ছিল বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকে জার্মানির প্রথম বিদায় এবং এশিয়ার কোনো দেশের কাছে প্রথম পরাজয়।
১০. সৌদি আরব ২-১ আর্জেন্টিনা (২০২২ বিশ্বকাপ)
টানা ৩৬ ম্যাচে অপরাজিত থেকে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা যখন কাতারে সৌদি আরবের মুখোমুখি হয়, তখন তাদের জয় ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। ম্যাচের ১০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে নেন মেসি। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার আরও দুটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। তবে দ্বিতীয়ার্ধে ঘটে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় রূপকথা। ৪৮ মিনিটে সালেহ আল-শেহরি আর্জেন্টিনার ডিফেন্স চূর্ণ করে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন। এর ঠিক ৫ মিনিট পর উইঙ্গার সালেম আল-দাওসারী বক্সের বাঁ দিক থেকে দারুণ এক বাঁকানো শটে বল জালে জড়ালে ২-১ এ এগিয়ে যায় সৌদি আরব।
শেষ মুহূর্তের সমস্ত আর্জেন্টাইন আক্রমণ রুখে দিয়ে ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয় সৌদিরা।
যদিও পরবর্তীতে আর্জেন্টিনা ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি জিতেছিল, তবে সৌদির এই মহাকাব্যিক জয় ফুটবল ইতিহাসের সেরা অঘটনগুলোর তালিকায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

