ব্যাডমিন্টন কোচ শিব্বির আহমদ

শুরুর গল্পটা ছিল ফুটবলের, শেষটা ব্যাডমিন্টনের জয়গানে।

ছোটবেলায় বিকেল কাটতো পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলে। সন্ধ্যার পর, র‍্যাকেট হাতে নামতেন ব্যাডমিন্টন কোর্টে। তৎকালে দুই খেলাতেই সমান পারদর্শী এই কিশোরের নাম শিব্বির আহমেদ। সময় গড়িয়েছে, বয়স বেড়েছে, কিন্তু র‍্যাকেটের প্রতি ভালোবাসাটা এতটুকুও কমেনি। বরং ফুটবলকে পেছনে ফেলে ব্যাডমিন্টনকেই জীবনের ধ্রুবতারা বানিয়েছেন তিনি।

১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজও থামেনি। শীতের সন্ধ্যায় সিলেট জেলা স্টেডিয়ামের কৃত্রিম আলোয় কর্কে শট মারার হাতেখড়ি হয়েছিল শিব্বিরের, এখন সেই কোর্টেই তৈরি করছেন শত খেলোয়াড়।

ব্যাডমিন্টনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে যেসব তরুণ খেলোয়াড় তার একাডেমিতে আসেন, সুনিপুণ দিকনির্দেশনায় তাদের প্রতিভার উন্মেষ ঘটে। এর মধ্যে কারও কারও নাম তো ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও।

ব্যক্তি থেকে পথপ্রদর্শক: এক কোচের জন্ম

নিজের খেলোয়াড়ি জীবনে শিব্বির আহমেদ ছিলেন তিনবারের জেলা চ্যাম্পিয়ন (২০০৩, ২০০৪), ছিলেন জাতীয় র‍্যাঙ্কিংয়ে সেরা ১১ জনের একজন। কিন্তু ২০০৯ সালে নিজের ক্যারিয়ারে দাঁড়ি টেনে নেন কোচিংকে ধ্যান-জ্ঞান করে। গড়ে তোলেন ‘সিলেট ব্যাডমিন্টন একাডেমি’, যা বর্তমানে দেশের অন্যতম সেরা ব্যাডমিন্টন প্রশিক্ষণকেন্দ্র।

শুরুটা হয়েছিল মাত্র একজন ছাত্র নিয়ে, আজ সেখানে শতাধিক খেলোয়াড়। জাতীয় দলে খেলেছেন এই একাডেমির ১৭-১৮ জন। শুধু পুরুষ খেলোয়াড়ই নয়, নারী খেলোয়াড়েরাও ছড়াচ্ছেন আলো।

হাতে গড়া তারকা: সালমান, মুন্না ও অরিন

শিব্বিরের হাত ধরেই উঠে এসেছেন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন সালমান খান, যিনি সাউথ এশিয়ান গেমসে স্বর্ণ জিতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন বিদেশের মাটিতে। একইভাবে মইনুল ইসলাম মুন্না, যিনি মরিশাস জাতীয় দলের প্রধান কোচ হয়েছিলেন। তিনিই প্রথম বাংলাদেশি, যিনি বিদেশি কোনোও জাতীয় দলের কোচ হিসেবে নিয়োগ পান।

নারী খেলোয়াড়দের তালিকায় আছেন মৌলি, যিনি ২০১৬ সালে জাতীয় ডাবলসে চ্যাম্পিয়ন হন, আর আফিফা খান অরিন সম্প্রতি নেপালে অনূর্ধ্ব-১৫ দলে জিতে এনেছেন ব্রোঞ্জ পদক।

শুধু খেলোয়াড় নয়, শিব্বির আহমেদ নিজেও কোচ হিসেবে দেশের জন্য এনে দিয়েছেন সাউথ এশিয়ান গেমসের সোনার পদক। শিব্বির-সালমান গুরু-শিষ্য মিলে ব্যাডমিন্টন ইতিহাসে যোগ করেছেন সেরা অর্জন।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি

দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত ত্যাগ আর সীমিত সম্পদে দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত শিব্বির আহমেদ এখন চান সরকারি সহযোগিতা। ক্রিকফুট২৪ডটকমকে তিনি বলেন, “ব্যাডমিন্টন অত্যন্ত ব্যয়বহুল খেলা। সরকার যদি মাসিক বেতন, সরকারি চাকরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেয়, তাহলে ক্রিকেট-ফুটবলের মতো ব্যাডমিন্টনও হয়ে উঠতে পারে দেশের গর্ব।”

তিনি উদাহরণ দেন ভারতের, যেখানে খেলোয়াড়েরা খেলার পাশাপাশি সরকারি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান। এতে খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারে নিরাপত্তা আসে, এবং তারা খেলার সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকতে পারেন।

“স্বপ্ন দেখো, লড়াই করো”

যেখানে অনেকে দেশ ছাড়ার স্বপ্নে বিভোর, শিব্বির আহমেদ ঠিক উল্টো পথের পথিক। বিদেশের চাকরি বা সুযোগের মোহ তাকে ছুঁতে পারেনি। কোর্টের কর্ক, কোর্টের ঘাম এই নিয়েই তাঁর দিন কাটে। তাঁর হাতে তৈরি খেলোয়াড়রা আজ দেশের মুখ উজ্জ্বল করছেন। আর তিনিও নিঃশব্দে গড়ছেন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ।

স্বপ্ন দেখা, আর সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপের জন্য নিয়ত লড়াই করে যাওয়াকেই ধ্যান করেছেন শিব্বির।

বাংলাদেশের খেলাধুলার পরিপূর্ণ উন্নয়নের জন্য ফুটবল ও ক্রিকেটের পাশাপাশি ব্যাডমিন্টনের মতো সম্ভাবনাময় খেলাগুলোর দিকেও নজর দেওয়া উচিত। শিব্বির আহমেদের মতো নিবেদিতপ্রাণ মানুষদের হাত ধরে হয়তো একদিন ব্যাডমিন্টনও হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম সাফল্যগাথা।