বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে গত ২৪ ঘণ্টা ছিল চরম নাটকীয়তায় ঠাসা। একদিকে ভারতের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন আজীবনের জন্য ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া, অন্যদিকে দীর্ঘ দেড় বছর নির্বাসনে থাকা সাকিব আল হাসানকে জাতীয় দলে ফেরানোর তোড়জোড়। বিসিবির ম্যারাথন বৈঠক শেষে হঠাৎ সাকিবের নাম সামনে আসা নিয়ে এখন ক্রিকেট পাড়ায় বইছে রহস্যের হাওয়া। প্রশ্ন উঠছে—ব্যর্থতার দায় এড়াতেই কি তবে পরিকল্পিতভাবে এই ‘সাকিব কার্ড’ ব্যবহার করল বোর্ড?
সময়ের ব্যবধানে বিশাল প্রশ্ন
সবচেয়ে বড় খটকা লেগেছে বিসিবির ঘোষণার টাইমিং নিয়ে। গতকালই আইসিসি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, বিসিবির অনড় অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে নেওয়া হয়েছে। এমন এক জাতীয় বিপর্যয়ের দিনে বোর্ড সভার প্রধান আলোচনা হওয়ার কথা ছিল—কেন আমরা বিশ্বকাপ হারলাম? কিন্তু সাত ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে বিসিবি পরিচালক আমজাদ হোসেন যখন জানালেন তারা সাকিবকে ফেরাতে চান, তখন উপস্থিত সংবাদকর্মীদের ভ্রু কুঁচকে যায়। বিসিবির এই চালকে অনেকেই ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বা জনরোষ কমানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন।
সাকিবের নির্বাসন ও রাজনৈতিক দেয়াল
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাকিবের ক্যারিয়ারে যে কালো মেঘ নেমে এসেছিল, তা সবার জানা। হত্যা মামলা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক এই সংসদ সদস্যের দেশে ফেরা হয়ে পড়েছিল অনিশ্চিত। মিরপুরে শেষ টেস্ট খেলে বিদায় নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও নিরাপত্তার অযুহাতে তাকে ফেরাতে পারেনি বোর্ড। সেই একই বোর্ড এখন কোন জাদুবলে তাকে ফেরানোর সাহস দেখাচ্ছে, তা এক বড় রহস্য।
সংবাদ সম্মেলনে পরিচালক আমজাদ ও আসিফ আকবরের কথা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—সাকিবের সঙ্গে পর্দার আড়ালে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। বোর্ড এখন মনে করছে, জাতীয় দলে সাকিবের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাকিবের বিরুদ্ধে থাকা হত্যা মামলার আইনি জটিলতা কীভাবে কাটবে? আমজাদ হোসেনের উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত, “সভাপতি বিষয়টি দেখছেন।” এই “সভাপতি দেখছেন” কথাটির মাঝেই লুকিয়ে আছে গভীর কোনো রহস্য।
বিশ্বকাপ ইস্যু আড়াল করার চেষ্টা?
সংবাদ সম্মেলন শেষে যখন এক পরিচালককে প্রশ্ন করা হলো, “বিশ্বকাপ ইস্যুর মধ্যে সাকিবকে সামনে এনে ভালোই খেলে দিলেন!”, তখন তাঁর গালভরা হাসিই যেন সব বলে দিচ্ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আশাটুকু যখন চিরতরে শেষ হয়ে গেল, তখন সেই বড় আঘাতটি জনগণের মন থেকে মুছে দিতেই সাকিবের প্রত্যাবর্তনকে সামনে আনা হয়েছে। বিসিবি আইসিসির সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে, কোনো আইনি লড়াইয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এই চরম ব্যর্থতা ঢাকতে সাকিবের মতো বড় নাম আর কিছুই হতে পারে না।
আরও পড়ুন: টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে যা বললো আইসিসি
সরকারের অবস্থান ও বিসিবির দায়
পরিচালক আসিফ আকবর জানিয়েছেন, সাকিবের ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক ইস্যুগুলো সরকার সামলাবে। কিন্তু বোর্ড কেন সাকিবের জন্য এই বিশেষ তৎপরতা দেখাচ্ছে? আসিফের মতে, “সাকিব সংসদ সদস্য হওয়ার আগেও ক্রিকেটার ছিলেন এবং বহু জয়ের নায়ক।”
তবে সত্যটা হলো, সাকিবের ফেরার ঘোষণাটি বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার ব্যর্থতা মোছার এক নিখুঁত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে ছিটকে পড়া এবং বিসিবি থেকে একের পর এক পরিচালকের পদত্যাগ যখন বোর্ডকে অভিভাবকহীন করে তুলছে, তখন এই ‘সাকিব কার্ড’ কতটুকু কাজে দেয়, সেটিই দেখার বিষয়। পর্দার আড়ালের এই রহস্য কি দেশের ক্রিকেটের উন্নতি ঘটাবে, নাকি স্রেফ ব্যর্থতা ঢাকার প্রলেপ হয়ে থাকবে—সেই উত্তর সময়ই দেবে।

