চ্যাম্পিয়নস লিগের চলতি আসরে প্রাথমিক পর্বে সব ম্যাচে জয় পেয়েছে কেবল আর্সেনালচ্যাম্পিয়নস লিগের চলতি আসরে প্রাথমিক পর্বে সব ম্যাচে জয় পেয়েছে কেবল আর্সেনাল। ছবি: গেটি ইমেজেস

ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের আসর ‘উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ’ কি তবে তার চিরচেনা রূপ হারাচ্ছে? মাঠের লড়াই আর পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। টুর্নামেন্টটি চ্যাম্পিয়নস লিগ হলেও এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন কেবল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের (EPL) জয়জয়কার। ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে শক্তিশালী লিগ হিসেবে ইপিএল যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রাথমিক পর্ব শেষে তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ইউরোপের বড় বড় লিগগুলোকে পেছনে ফেলে ইংলিশ ক্লাবগুলোর এই ছড়ি ঘোরানো ফুটবল বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

ইউরোপের দখল নিল ইংল্যান্ডের পাঁচ পরাশক্তি

গত বুধবার শেষ হওয়া চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রাথমিক পর্বে ইংল্যান্ডের দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। আট ম্যাচের সবকটিতে জিতে টেবিলের শীর্ষে থেকে সরাসরি শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে আর্সেনাল। গানারদের এই সাফল্য যেখানে রূপকথাকেও হার মানায়, সেখানে পিএসজি বা রিয়াল মাদ্রিদের মতো হেভিওয়েটরাও তাদের ধারেকাছে আসতে পারেনি।

তালিকায় শীর্ষ আটের মধ্যে থাকা বাকি চারটি ইংলিশ ক্লাব হলো লিভারপুল (৩য়), টটেনহ্যাম (৪র্থ), চেলসি (৬ষ্ঠ) ও ম্যানচেস্টার সিটি (৮ম)।

মজার ব্যাপার হলো, ইউরোপে চতুর্থ হয়ে সরাসরি শেষ ষোলোতে ওঠা টটেনহ্যাম কিন্তু প্রিমিয়ার লিগের পয়েন্ট টেবিলে লড়ছে ১৪ নম্বরে থেকে! এটিই প্রমাণ করে প্রিমিয়ার লিগের গভীরতা কতটা প্রখর।

টটেনহ্যাম কোচ টমাস ফ্র্যাঙ্ক তাই স্পষ্ট করেই বলেছেন, “এটা স্পষ্ট আধিপত্য।” তার মতে, কয়েক বছর ধরে প্রিমিয়ার লিগকে বিশ্বের সেরা লিগ বলার যে দাবি তোলা হচ্ছে, এই ফলাফল তারই অকাট্য প্রমাণ।

নিউক্যাসলের হাত ধরে নতুন ইতিহাসের হাতছানি

প্লে-অফে জায়গা করে নেওয়া নিউক্যাসল ইউনাইটেড এখন দাঁড়িয়ে এক অনন্য রেকর্ডের সামনে। আজারবাইজানের ক্লাব কারাবাখকে দুই লেগের লড়াইয়ে হারাতে পারলেই প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে দেখা যাবে প্রিমিয়ার লিগের ছয়টি ক্লাবকে। এমন গৌরবময় অধ্যায় আগে কখনো কোনো একটি দেশের লিগ থেকে রচিত হয়নি।

ইতালিয়ান সাংবাদিক দাভিদে চিনেল্লাতোর পর্যবেক্ষণে ফুটে উঠেছে এই আকাশ-পাতাল পার্থক্যের কারণ। তিনি মনে করেন, ইতালিয়ান বা স্প্যানিশ দলগুলো হয়তো বিচ্ছিন্ন কোনো ম্যাচে জিততে পারে, কিন্তু পুরো মৌসুমের লড়াইয়ে ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপুল অর্থসম্পদ, তারকা খেলোয়াড় আর গভীরতার কাছে সবাই অসহায়।

অর্থশক্তির মহড়া ও স্প্যানিশ-ইতালিয়ান ট্র্যাজেডি

ইউরোপের মঞ্চে এবার লা লিগা ও সেরি আর ক্লাবগুলোর পারফরম্যান্স ছিল যাচ্ছেতাই। স্প্যানিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে ইংলিশ দলগুলোর ১০ ম্যাচের ৯টিতেই জয় এসেছে প্রিমিয়ার লিগের পক্ষে, যেখানে গোলের ব্যবধান ২১-৫!

ইতালির চ্যাম্পিয়ন নাপোলি চেলসির কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে গেছে। এই সাফল্যের পেছনে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে অর্থের ঝনঝনানি।

ডেলোয়েটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ৩০টি ক্লাবের অর্ধেকই এখন ইংল্যান্ডের। গত গ্রীষ্মে রেকর্ড ৩০০ কোটি পাউন্ড খরচ করে দল সাজানোই আজ ইংলিশ ফুটবলকে ইউরোপের অধীশ্বর বানিয়ে দিয়েছে।

Read More: ইউসিএল: মেসিকে ছুঁলেন লেভা, রোনালদোকে ছাড়িয়ে এমবাপ্পে আর সালাহর প্রথম

আয়ের পাহাড়ে ইংলিশ ক্লাবগুলো

মাঠের এই আধিপত্য সরাসরি প্রভাব ফেলছে ক্লাবগুলোর ব্যাংক ব্যালেন্সে। ইএসপিএন-এর তথ্যমতে, এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগের মোট ২৫০ কোটি ইউরো পুরস্কারের পাঁচ ভাগের এক ভাগই (প্রায় ৫০ কোটি ইউরো) যাচ্ছে ইংল্যান্ডের ছয় ক্লাবের পকেটে।

বিশেষজ্ঞ কাইরান ম্যাগুইয়ারের মতে, সরাসরি শেষ ষোলোতে ওঠা প্রতিটি ক্লাব প্রায় ১০ কোটি ইউরো করে আয় করতে পারে। আর্থিক এই বিশাল ব্যবধানই রিয়াল মাদ্রিদ বা বার্সেলোনাকে একসময় ‘সুপার লিগ’ গড়ার স্বপ্নে বিভোর করেছিল। বর্তমানে উয়েফা র‌্যাঙ্কিংয়েও ২০.০৬৯ পয়েন্ট নিয়ে সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে ইংল্যান্ড। ইউরোপা লিগ থেকে কনফারেন্স লিগ—সবখানেই এখন ব্রিটিশ ফুটবলের জয়গান।