ফুটবল বিশ্বে দলবদল মানেই এক ক্লাবের প্রয়োজন আর অন্য ক্লাবের জোগান। কিন্তু যখন দুটি ক্লাবের মালিক একই গোষ্ঠী হয়, তখন সেই সমীকরণ আর সাধারণ থাকে না। ব্লু-কো (BlueCo) গ্রুপের অধীনে থাকা চেলসি এবং ফরাসি ক্লাব স্ট্রাসবার্গের মধ্যে চলতি মৌসুমে ১২টি দলবদল সম্পন্ন হয়েছে। ডেভিড দাতরো ফোফানার লোন মুভ থেকে শুরু করে কোচ লিয়াম রোজেনিওরকে ছিনিয়ে নেওয়া—সব মিলিয়ে ফুটবল বিশ্ব এখন এই ‘রহস্যময়’ লেনদেনের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাচ্ছে।
স্ট্রাসবার্গ: চেলসির ‘নার্সারি’ নাকি নতুন শক্তির উত্থান?
ব্লু-কো গ্রুপের অধীনে আসার পর থেকে স্ট্রাসবার্গের আর্থিক চিত্র বদলে গেছে রাতারাতি। যেখানে এই ফরাসি ক্লাবটি বছরে মাত্র ৬ থেকে ৯ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করতে হিমশিম খেত, সেখানে গত মৌসুমে তাদের খরচ ৯৬.৫ মিলিয়ন পাউন্ড ছাড়িয়েছে! এমনকি তারা ট্রান্সফার মার্কেটে পিএসজি-কেও টেক্কা দিয়েছে।
কিন্তু এই ‘টাকার গরম’ কি স্ট্রাসবার্গের উন্নতির জন্য? বিশ্লেষকরা বলছেন, মোটেও না। চেলসি তাদের স্কাউটিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জোকুইন পানিচেলির মতো প্রতিভা খুঁজে আনছে ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে সেরা সম্পদগুলো কেড়ে নিচ্ছে স্ট্রাসবার্গের থেকে।
ক্লাবের আইকনিক অধিনায়ক ইমানুয়েল এমেগা যখন মৌসুম শেষে চেলসিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন, তখন ভক্তদের ক্ষোভ আকাশচুম্বী হয়। তারা দাবি তোলেন, এমেগাকে এখনই ক্যাপ্টেনের আর্মব্যান্ড ফিরিয়ে দিতে হবে।
খেলোয়াড়দের নিয়ে ‘যুগলবন্দী’ খেলা
এই দলবদলের সবচেয়ে অদ্ভুত দিক হলো খেলোয়াড়দের যাওয়া-আসা। কিছু লোন ডিল নয়, বরং পার্মানেন্ট ফি দিয়ে খেলোয়াড় কেনা হচ্ছে এবং কয়েকমাস পরেই আবার তাদের পুরনো ক্লাবে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
মামাদু সার-এর ঘটনা: জুন মাসে চেলসি তাকে স্ট্রাসবার্গ থেকে কিনে নেয়। একটি ম্যাচ খেলিয়েই আবার স্ট্রাসবার্গে লোনে পাঠিয়ে দেয়। আর দলবদলের ডেডলাইন ডে-তে তাকে আবারও চেলসিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
অ্যারন আনসেলমিনোর চোখের জল: চেলসির কৌশলগত প্রয়োজনে ডর্টমুন্ড থেকে আনসেলমিনোকে মাঝপথে ফিরিয়ে আনা হয় কেবল স্ট্রাসবার্গের রক্ষণভাগ পূর্ণ করতে। ডর্টমুন্ড ছাড়ার সময় এই তরুণের কান্না প্রমাণ করে দেয়, খেলোয়াড়দের ইচ্ছা-অনিচ্ছার চেয়ে ক্লাবের ‘স্ট্র্যাটেজি’ এখানে মুখ্য।
ফিফা ও উয়েফার নতুন মাথাব্যথা
চেলসি বরাবরই ‘লোন আর্মি’ (একসাথে ৩৫ জন খেলোয়াড়কে লোনে পাঠানো) তৈরি করে ফিফার নিয়ম বদলে দিতে বাধ্য করেছিল। এবারও কি একই ইতিহাস ঘটবে?
উয়েফা তাদের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে যে, মাল্টি-ক্লাব ওনারশিপ (MCO) দলবদলের বাজারকে বিকৃত করতে পারে। এতে খেলোয়াড়দের প্রকৃত মূল্যের বদলে বিনিয়োগকারীদের সুবিধা অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হয়।
ইতোমধ্যেই উয়েফা একই টুর্নামেন্টে একই মালিকানাধীন দুটি ক্লাবের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি শুরু করেছে। যার ফলে ক্রিস্টাল প্যালেসকে ইউরোপা লিগ থেকে অবনমন দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত: নিয়ম বনাম নৈতিকতা
ফুটবল ফিন্যান্স বিশেষজ্ঞ কিরান ম্যাগুইয়ারের মতে, ফিফা বা উয়েফা চাইলেও এই প্রথা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে না। কারণ ক্লাবগুলো সবসময়ই আইনের কোনো না কোনো ফাঁকফোকর বের করে নেবে। চেলসি দাবি করছে তারা কেবল নিয়মের সর্বোচ্চ সুবিধা নিচ্ছে।
তবে রেড বুল গ্রুপ (লিপজিগ ও সালজবার্গ) বা ওয়াটফোর্ড-উদিনেসের মতো ক্লাবগুলো বছরের পর বছর এই মডেল চালালেও, চেলসির মতো এত আগ্রাসী রূপ আগে দেখা যায়নি।
স্ট্রাসবার্গ চেলসির স্কাউটিং আর টাকা ব্যবহার করে লিগ ওয়ানের বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে, কিন্তু সেই সাফল্যের রাশ থাকবে লন্ডনের হাতে। ফুটবলের সৌন্দর্য যেখানে ছোট ক্লাবের বড় হয়ে ওঠার গল্পে, সেখানে স্ট্রাসবার্গের মতো ক্লাবগুলো যদি কেবল চেলসির ‘দাবার ঘুঁটি’ হয়ে থাকে, তবে ফুটবলের রোমান্টিকতা অচিরেই হারিয়ে যাবে।

