জামাল ভূঁইয়া কিংবা প্রিমিয়ার লিগ মাতানো হামজা চৌধুরীদের ডাগআউটে কোন নতুন মুখ বসছেন, সেই ধাঁধার অবসান ঘটল। আড়াইশ’র বেশি জীবনবৃত্তান্তের স্তূপ ঘেঁটে অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বিশ্বকাপ অধিনায়ক থমাস ডুলির হাতে জাতীয় ফুটবল দলের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে বাফুফে। আজ শুক্রবার সকাল ৯টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় পা রেখেছেন ৬৫ বছর বয়সী এই জার্মান-আমেরিকান।
বাফুফে তাদের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নতুন কোচের নাম ঘোষণা করার পর থেকেই দেশের ফুটবল মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে—এই হাই-প্রোফাইল কোচ কি পারবেন দেশের ফুটবলের দীর্ঘদিনের খরা কাটাতে? নাকি আগের অনেক বিদেশি কোচের মতোই ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বিদায় নেবেন?
আগামী ৫ জুন সান মারিনোর বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ দিয়ে লাল-সবুজের ডাগআউটে শুরু হচ্ছে উয়েফা প্রো লাইসেন্সধারী এই কোচের প্রথম পরীক্ষা।
পাঁচ দশকের ট্রফি ও ট্র্যাজেডির ইতিহাস
১৯৭৮ সালে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির ওয়ার্নার বেকেল হপ্টকে দিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলে বিদেশি কোচের যে অধ্যায় শুরু হয়েছিল, তা আজ প্রায় পাঁচ দশকে পা রাখল। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে অল্প কয়েকজন কোচই এ দেশের ফুটবলে স্থায়ী ছাপ রাখতে পেরেছেন। নব্বইয়ের দশকে জার্মান কোচ অটো ফিস্টার মোনেম মুন্নাদের নিয়ে মিয়ানমারে চার জাতির টাইগার ট্রফি জিতে দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা এনে দিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশের নতুন কোচ কে এই থমাস ডুলি?
পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে ইরাকি কোচ সামির শাকেরের অধীনে দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে ঐতিহাসিক সোনা জেতে বাংলাদেশ, যদিও বিদায়বেলায় বাফুফে কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে একাকী দেশ ছেড়েছিলেন তিনি।
আর এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য ২০০৩ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি, যা এসেছিল অস্ট্রিয়ান জর্জ কোটানের হাত ধরে।
এরপর গত কয়েক বছরে অনেক কোচই এসেছেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী কোনো উন্নতি দেখাতে পারেননি। জেমি ডের অধীনে ২০১৮ এশিয়ান গেমসে কাতারকে হারিয়ে শেষ ১৬-তে ওঠার পর দেশের ফুটবলে কিছুটা জোয়ার এলেও তা টেকেনি।
সবশেষ স্প্যানিশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরা রেকর্ড ৫২ মাস ডাগআউটে থেকেও সাফের সেমিফাইনাল ছাড়া বড় কোনো ট্রফি এনে দিতে পারেননি।
ডুলির বর্ণাঢ্য প্রোফাইল ও এশীয় অভিজ্ঞতা
বাফুফে শুরুতে উয়েফার ক্রিস কোলম্যানকে নিয়ে বড় পরিকল্পনা করলেও এজেন্ট ফি জটিলতায় তা ভেস্তে যায়।
ফলত তারা বেছে নেয় দীর্ঘ ৪৩ বছরের ফুটবল ক্যারিয়ার সম্পন্ন থমাস ডুলিকে। খেলোয়াড়ি জীবনে ডুলি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে স্বাগতিক দলের হয়ে প্রতিটি ম্যাচ খেলা ডুলি ১৯৯৮ বিশ্বকাপে মার্কিন দলের অধিনায়কত্ব করেছিলেন।
ক্লাব ফুটবলে থমাস ডুলি বায়ার লেভারকুসেন ও শালকের মতো ক্লাবে খেলে জেতেন উয়েফা কাপ ও বুন্দেসলিগা।
কোচ হিসেবেও তাঁর ঝুলিতে আছে মার্কিন দলে ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যানের সহকারী হিসেবে ৪৫ ম্যাচের অভিজ্ঞতা।
এশিয়ান ফুটবলেও ডুলি বেশ সফল। তাঁর অধীনে ফিলিপাইন দল অপরাজিত থেকে এশিয়ান কাপের মূল পর্বে খেলেছিল এবং নিজেদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ফিফা র্যাঙ্কিং অর্জন করে। এছাড়া ভিয়েতনামের ক্লাব ভিয়েতেল ও মালয়েশিয়ার শ্রী পাহাং ঘুরে সর্বশেষ গায়ানা জাতীয় দলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি, যেখানে শেষ চার ম্যাচের সবকটিতেই জয় পান।
বাফুফের ভরসা বনাম আসল সংকট
সাধারণত ৩-৫-২ অ্যাটাকিং ফরমেশন পছন্দ করা থমাস ডুলিকে নিয়ে বাফুফে রোমাঞ্চ প্রকাশ করলেও দেশের ফুটবল বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশ দলের মূল সংকট কৌশল বা বড় সিভির অভাব নয়; এখানে প্রধান সমস্যা হলো একজন আন্তর্জাতিক মানের প্রথাগত স্ট্রাইকারের অভাব।
প্রকৃত স্ট্রাইকারহীন একটি দল নিয়ে ডুলি কীভাবে মাঠের ফুটবলে গোল আদায় করবেন, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আগামী রোববার থেকে শুরু হতে যাওয়া জাতীয় দলের ক্যাম্পে যোগ দেবেন ডুলি। তিনি কি অটো ফিস্টার বা জর্জ কোটানের মতো সাফল্যের নতুন কোনো স্ফুলিঙ্গ জ্বালাতে পারবেন, নাকি কাঠামোগত দুর্বলতা আর প্রশাসনিক অস্থিরতার বাস্তবতায় হারিয়ে যাবেন—তা সময়ই বলে দেবে।

