বর্তমান ফুটবল বিশ্বে ম্যানচেস্টার সিটি কেবল তাদের ট্যাকটিক্যাল শ্রেষ্ঠত্বের জন্যই পরিচিত নয়, বরং ড্রেসিংরুমের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির জন্যও তারা অনন্য। পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে ইতিহাদ স্টেডিয়ামে এবার যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা ক্রীড়াঙ্গনে ধর্মীয় সহনশীলতার এক দারুণ উদাহরণ। বিশেষ করে লিডস ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচে রোজাদার মুসলিম খেলোয়াড়দের জন্য সম্ভাব্য ‘ইফতার বিরতি’ নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা প্রমাণ করে ফুটবল কেবল একটি খেলার নাম নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধের এক মেলবন্ধন।
গার্দিওলার দৃষ্টিভঙ্গি: শ্রদ্ধা ও পেশাদারিত্বের ভারসাম্য
ম্যানচেস্টার সিটির বর্তমান স্কোয়াডে ওমর মারমুশ, রাইয়ান আইত-নুরি, রাইয়ান চেরকি এবং আবদুকোদির খুসানভের মতো প্রতিভাবান মুসলিম খেলোয়াড়রা নিয়মিত খেলছেন। প্রিমিয়ার লিগের চাপের মধ্যে রোজা রাখা চ্যালেঞ্জিং হলেও, কোচ পেপ গার্দিওলার অটল সমর্থন খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে।
খেলোয়াড়দের খাদ্যাভ্যাস এবং প্রস্তুতি প্রসঙ্গে গার্দিওলা বলেন, “তারা তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য মেনে চলছে। আমাদের ক্লাবের পুষ্টিবিদরা অত্যন্ত দক্ষ, যারা এই সময় দলের প্রয়োজনের সাথে খেলোয়াড়দের খাদ্যাভ্যাসকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলেন।”
তবে প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ সূচি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এটি মনে করিয়ে দিয়ে গার্দিওলা আরও বলেন, “আমরা তো লিগের ম্যাচগুলোর সময় পরিবর্তন করতে পারি না। তবে আমি মনে করি, এই খেলোয়াড়রা এতে অভ্যস্ত। তারা কেউ ছোট নয়, অনেক বছর ধরে এই সময়ে তারা খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের জন্য এটি নতুন কিছু নয়।”
ইমাম ইসমাইল ও সিটির ড্রেসিংরুমের অন্দরে
২০১৬-১৭ মৌসুম থেকে ম্যানচেস্টার সিটির সাথে যুক্ত হয়েছে ‘মুসলিম চ্যাপ্লেনস ইন স্পোর্টস’ (MCS)। এই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ইমাম ইসমাইল ভামজি নিয়মিত ক্লাবে খেলোয়াড়দের ধর্মীয় এবং মানসিকভাবে সহায়তা করেন। তাঁর সাথে গার্দিওলার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে।
গার্দিওলার কণ্ঠে বিষয়টি উঠে এসেছে এভাবে, “গত সপ্তাহে আমার সাথে পেপ গার্দিওলার দেখা হয়েছিল। তিনি আমার হাত ধরে আমাকে ‘রমজান কারিম’ বলে শুভেচ্ছা জানান। একজন কোচের কাছ থেকে এমন সৌজন্য পাওয়াটা সত্যিই চমৎকার।”
ইমাম ইসমাইল কেবল ধর্মীয় দিকনির্দেশনাই দেন না, বরং সমসাময়িক জটিল ইস্যুতেও খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়ান। তিনি বলেন, “গাজা যুদ্ধের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে খেলোয়াড়রা অনেক সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তখন আমি তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়, সে বিষয়ে পরামর্শ দেই।”

ইমাম ইসমাইল উল্লেখ করেন, “আমরা ক্লাবগুলোকে বুঝিয়েছি রমজান কী এবং কেন এটি ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। আমরা খেলোয়াড়দের বুঝিয়েছি কীভাবে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা পালন করেও খেলা চালিয়ে নেওয়া যায়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমরা ক্লাবের ওপরই ছেড়ে দেই, আমরা কাউকে নির্দেশ দিতে পারি না।”
গার্দিওলার সাথে তাঁর সাম্প্রতিক দেখা হওয়া প্রসঙ্গে ইমাম হাসিমুখে বলেন, “গত সপ্তাহে আমার সাথে পেপ গার্দিওলার দেখা হয়েছিল। তিনি আমার হাত ধরলেন এবং আমাকে ‘রমজান করিম’ বলে শুভেচ্ছা জানালেন। এটি তাঁর পক্ষ থেকে অত্যন্ত চমৎকার একটি সৌজন্য ছিল।”
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন
ম্যানচেস্টার সিটির সাথে মুসলিম খেলোয়াড়দের সম্পর্ক বহু পুরনো। ইয়ায়া তোরের সেই বিখ্যাত ‘শ্যাম্পেন বিতর্ক’ থেকে শুরু করে রিয়াদ মাহরেজ বা ইলকায় গুন্দোয়ানের অবদান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সিটি তাদের খেলোয়াড়দের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান জানিয়েছে। এমনকি ট্রেনিং কিটে অ্যালকোহল ব্র্যান্ডের বদলে অ্যালকোহলমুক্ত পণ্যের লোগো ব্যবহার করাও এই সম্মানেরই অংশ।
সামনে ঈদ ও ট্রফির স্বপ্ন
এবারের রমজানের শেষ দিকে ২০ বা ২১ মার্চ ঈদ উদযাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। আর ঈদের ঠিক পরপরই ওয়েম্বলিতে আর্সেনালের বিপক্ষে কারাবাও কাপের ফাইনাল। ম্যানসিটির ড্রেসিংরুমে এখন সবার একটাই লক্ষ্য—ঈদের আনন্দের সাথে একটি শিরোপা জয় করে সমর্থকদের ডাবল গিফট দেওয়া।

