কাজী সালাহউদ্দিনের দীর্ঘ ১৬ বছরের রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে যখন তাবিথ আউয়াল বাফুফের সিংহাসনে বসলেন, তখন দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মনে নতুন আশার আলো জেগেছিল। সালাহউদ্দিন-উত্তর যুগে এক সাবেক ফুটবলার ও সফল ব্যবসায়ীর হাত ধরে ফুটবলে আধুনিকতা ও তৃণমূলের জাগরণ ঘটবে—এমনটাই ছিল প্রত্যাশা। তাবিথ নিজেও শুনিয়েছিলেন ‘সুপারস্টার’ তৈরি ও ডিজিটাল ক্লাবের স্বপ্ন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছর পর প্রাপ্তির খাতা মেলাতে গেলে সাফল্যের চেয়ে দীর্ঘশ্বাসের পাল্লাই ভারী মনে হচ্ছে।
জেলায় জেলায় ফুটবলের ‘অঘোষিত কারফিউ’
তাবিথ আউয়ালের পরিকল্পনায় জেলা ফুটবল অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর। গত এক বছরে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে লিগ হয়েছে মাত্র ৫টিতে—চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, মাগুরা, সিলেট ও কিশোরগঞ্জ। বাকি ৫৯টি জেলায় ফুটবল যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
ঐতিহ্যের নারায়ণগঞ্জে ২০১৮ সালের পর লিগ হয়নি, চাঁদপুরে খেলা বন্ধ ২০১৪ সাল থেকে। তৃণমূলের এই স্থবিরতা নিয়ে জেলা ফুটবল কমিটির প্রধান ইকবাল হোসেনের প্রতিশ্রুতি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। তৃণমূল না বাঁচলে বাফুফের অস্তিত্ব কোথায়—এই প্রশ্ন এখন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের।
তালাবদ্ধ আগামীর ‘খেলোয়াড় তৈরির কারখানা’
দেশের ফুটবলের সাপ্লাই লাইন খ্যাত ‘পাইওনিয়ার লিগ’ ২০২২ সাল থেকে বাক্সবন্দী। মোনেম মুন্না কিংবা আরমান মিয়াদের উঠে আসার এই মঞ্চটি এখন অভিভাবকহীন। হাস্যকরভাবে, লিগ কমিটির চেয়ারম্যান টিপু সুলতানের মেয়াদ শেষ হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটিই গঠিত হয়নি!
পাইওনিয়ার লিগ ছাড়াও ঢাকা দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ লিগ ২০২৩ সাল থেকে বন্ধ। ভিত নড়বড়ে রেখে ছাদ সাজানোর এই নীতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের ফুটবলকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের ইউরোপ ইতিহাস পুরনো!
শম্বুক গতির প্রিমিয়ার লিগ
দেশের শীর্ষ লিগের হালচাল আরও করুণ। গত ২৬ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ১০ দলের লিগে সাড়ে ছয় মাসে দলগুলো ম্যাচ খেলেছে মাত্র ১১টি! যেখানে একই সময়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দলগুলো ৩১টি করে ম্যাচ শেষ করেছে। লিগের এই দীর্ঘ বিরতি ফুটবলারদের ফর্ম নষ্ট করার পাশাপাশি ক্লাবগুলোর আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। তাবিথ ডিজিটাল ক্লাবের স্বপ্ন দেখালেও মাঠের মান উন্নয়ন কিংবা সম্প্রচারের গুণগত মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি।
প্রবাসী নির্ভরতা: অন্যের জমিতে ফসল খোঁজা?
বর্তমান কমিটির অধীনে সবচেয়ে বড় চমক ছিল প্রবাসী ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তি। হামজা চৌধুরীকে আনার প্রক্রিয়া সালাহউদ্দিনের আমলে শুরু হলেও তাবিথের সময়ে শমিত, ফাহামিদুলদের মতো অনেক প্রবাসীকে জাতীয় দলের রাডারে আনা হয়েছে। বাফুফে এখন প্রবাসী স্কাউটিংয়ে যতটা আগ্রহী, তৃণমূল থেকে নতুন ফুটবলার তৈরিতে ততটাই উদাসীন। প্রবাসী ফুটবলার দিয়ে সাময়িক ফল পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদী ভিত তৈরি হয় না—এটিই বড় শঙ্কা।
আরও পড়ুন: হামজা চৌধুরীর আগমনে ফুটবলে উন্মাদনা, তবু অধরা বাফুফের রোডম্যাপ
সাফল্যের উজ্জ্বল কিছু বিন্দু
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। তাবিথ জমানায় ফুটবলের বাণিজ্যিকীকরণ বেড়েছে, জাতীয় দল পেয়েছে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা। মেয়েদের সাফ শিরোপা ধরে রাখা, অনূর্ধ্ব-২০ ছেলেদের সাফ জয় এবং প্রথমবারের মতো মেয়েদের এশিয়ান কাপে খেলা এ সময়ের উল্লেখযোগ্য অর্জন। সরকারি সহায়তায় বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতাও মাঠে গড়িয়েছে।
এবং..
কোচ নিয়োগ বা জাতীয় দলের ক্যাম্প করা বাফুফের রুটিন কাজ। কিন্তু বাফুফে সভাপতির মূল মূল্যায়ন হওয়া উচিত ফুটবলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও তৃণমূলের সক্রিয়তায়। তাবিথ আউয়াল সফল সংগঠক হতে পারেন, কিন্তু দ্রুত জেলা ফুটবলের অচলাবস্থা কাটাতে না পারলে তাঁর ‘নতুন যুগ’ শেষ পর্যন্ত পুরোনো ব্যর্থতারই পুনরাবৃত্তি হিসেবে গণ্য হবে।

