লেস্টার সিটিতে হামজা চৌধুরীদের ভবিষ্যৎ শঙ্কায়।লেস্টার সিটিতে ভবিষ্যৎ ঘিরে হামজাদের শঙ্কা আছে। ছবি: ওয়ান ফুটবল

২০১৬ সালে যখন লেস্টার সিটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিতেছিল, তখন ফুটবল বিশ্ব একে শতাব্দীর সেরা রূপকথা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে সেই রূপকথা এখন এক বিভীষিকায় পরিণত হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে ঘরের মাঠে হাল সিটির সাথে ২-২ গোলে ড্র করার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে গেছে হামজা চৌধুরীদের লিগ ওয়ানে (ইংলিশ ফুটবলের তৃতীয় স্তর) অবনমন। গত দুই দশকের মধ্যে লেস্টারই মাত্র পঞ্চম ক্লাব যারা টানা দুই মৌসুমে ব্যাক-টু-ব্যাক অবনমনের শিকার হয়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকল। বর্তমানে ৮ হাজার কোটি ঋণের চাপেও তারা পিষ্ট।

মাঠের লড়াই ও হামজাদের ব্যর্থতা

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরী ও তার দলের ওপর প্রত্যাশা ছিল অনেক। চ্যাম্পিয়নশিপে বেশ কিছু দামী এবং অভিজ্ঞ খেলোয়াড় থাকা সত্ত্বেও তারা প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে ১৯টি লিগ ম্যাচের মধ্যে তারা জিতেছে মাত্র ২টিতে।

অথচ এই দলের বেতন বিল এখনো চ্যাম্পিয়নশিপের অনেক ক্লাবের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। ৬ পয়েন্টের পেনাল্টি বা আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের শাস্তি হয়তো গাণিতিকভাবে তাদের এই অবনমনকে প্রভাবিত করেছে, কিন্তু মাঠের খেলায় নিস্তেজ লেস্টার অনেক আগেই লড়াই থেকে ছিটকে গিয়েছিল।

ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখা এক ক্লাব

ফুটবল ফিন্যান্স বিশেষজ্ঞ কিয়েরান ম্যাগুইয়ারের দেওয়া তথ্যমতে, লেস্টারের এই পতনের মূল কারণ মাঠের খেলার চেয়েও মাঠের বাইরের অব্যবস্থাপনা। লেস্টার সিটি তাদের ‘আগামীকালের টাকা আজ খরচ করে ফেলেছে’।

লেস্টারের যে ঋণের বোঝা, তা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা! যা ক্লাবটির ভিত একেবারে নাড়িয়ে দিচ্ছে।

১. চড়া সুদে ঋণ: অস্ট্রেলিয়ার ম্যাকুয়ারি ব্যাংক থেকে অন্তত ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড ঋণ নিয়েছে ক্লাবটি, যার সুদের হার ৮ থেকে ৯ শতাংশ।

২. প্যারাশুট পেমেন্ট বন্ধক: প্রিমিয়ার লিগ থেকে অবনমিত হওয়ার পর ক্লাবগুলো যে বিশাল অঙ্কের ‘প্যারাশুট পেমেন্ট’ পায়, লেস্টার তাদের ২০২৬-২৭ মৌসুমের সেই ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ডের কিস্তিও আগেভাগেই ব্যাংক থেকে তুলে খরচ করে ফেলেছে।

৩. খেলোয়াড় বিক্রির অর্থ: টম ক্যানন বা জেমস জাস্টিনদের মতো খেলোয়াড়দের বিক্রির কিস্তির টাকাও এখন আর ক্লাবের হাতে আসবে না, কারণ সেই অর্থও ঋণের বিপরীতে আগেই ব্যাংককে সঁপে দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: রূপকথা থেকে দুঃস্বপ্নের গহ্বরে: হামজার লেস্টার সিটির ট্র্যাজিক পতন

লিগ ওয়ানের কঠিন বাস্তবতা ও বেতনের বোঝা

লিগ ওয়ানে যাওয়ার পর লেস্টারের বড় সমস্যা হবে খেলোয়াড়দের আকাশচুম্বী বেতন। গত মৌসুমেও তাদের বেতন বিল ছিল প্রায় ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ড।

রিকার্ডো পেরেইরা বা প্যাটসন ডাকার মতো কিছু খেলোয়াড়ের চুক্তি শেষ হলেও অলিভার স্কিপ (২০২৯ পর্যন্ত) বা হ্যারি উইঙ্কসদের (সাপ্তাহিক ৯০ হাজার পাউন্ড) মতো চড়া বেতনের খেলোয়াড়রা এখনো চুক্তিবদ্ধ।

লিগ ওয়ানে যেখানে একটি ক্লাবের গড় বাৎসরিক খরচ হয় সাড়ে ৯ মিলিয়ন পাউন্ড, সেখানে লেস্টারের বেতন বিল হবে বিশাল এক বোঝা।

লিগ ওয়ানের নতুন আর্থিক নিয়ম অনুযায়ী, মালিকপক্ষের আয়ের মাত্র ৬০ শতাংশ দলের পেছনে খরচ করা যাবে। এই কঠিন সমীকরণ মেলাতে গিয়ে ক্লাবটি দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

কিং পাওয়ার সাম্রাজ্যের ভাঙন

থাইল্যান্ডের ‘কিং পাওয়ার গ্রুপ’ মূলত ডিউটি-ফ্রি শপিং ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। করোনা মহামারীর পর থেকে তাদের ব্যবসায়িক মন্দা এবং থাইল্যান্ড থেকে আসা খবর অনুযায়ী, মালিকপক্ষের হাতে ক্লাব পুনর্গঠন করার মতো যথেষ্ট নগদ অর্থ নেই। লিগ ওয়ানে টিভি স্বত্ব থেকে আয় মাত্র ২ মিলিয়ন পাউন্ড। এই সামান্য আয় দিয়ে লেস্টারের বিশাল ‘ব্ল্যাক হোল’ বা আর্থিক গর্ত পূরণ করা কার্যত অসম্ভব।

আরও পড়ুন: আপিলেও হেরে গেল হামজার লেস্টার সিটি

কোথায় গিয়ে থামবে এই পতন?

হামজা চৌধুরীর লেস্টার সিটি এখন এমন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে, যেখানে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। যদি আগামী মৌসুমে তারা সরাসরি চ্যাম্পিয়নশিপে ফিরতে না পারে, তবে বার্মিংহাম বা সান্ডারল্যান্ডের মতো দীর্ঘ সময় তৃতীয় স্তরে আটকে থাকতে হতে পারে তাদের।

রূপকথার সেই লেস্টার সিটি এখন দেনার দায়ে জর্জরিত এক নিঃস্ব ক্লাব, যাদের ভবিষ্যৎ টিকে আছে কেবল অলৌকিক কোনো বিনিয়োগের ওপর।