আকাশে মেঘের আনাগোনা। গ্যালারিতে রঙের মেলা। সিলেট জেলা স্টেডিয়াম আজ এক জীবন্ত ক্যানভাস। সুনসান নীরবতা ভেঙে জেগে উঠেছে মাঠ। নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া পাহারা। সংবাদকর্মীদের ক্যামেরার ঝলকানি। সব আয়োজন কেবল একদল খুদে নক্ষত্রকে ঘিরে।
বিকেল ৫টা ৮ মিনিট। ঘড়ির কাঁটা থমকে দাঁড়াল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্বোধন করলেন ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’। ১৯৭৬ সালের সেই চেনা সুর। আশির দশকের সেই প্রিয় নাম। তবে এবার মঞ্চে নয়, খেলা হবে ঘাসে ঢাকা সবুজ গালিচায়। শিল্প থেকে মাঠ—প্রতিভা অন্বেষণের নতুন এক দিগন্ত।
লন্ডনের রেস্টুরেন্ট থেকে সিলেটের মাঠ
বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে মাঠে এলেন প্রধানমন্ত্রী। চিরাচরিত বক্তৃতার পথে হাঁটলেন না তিনি। হাতের কাগজ সরিয়ে রেখে হাসিমুখে বললেন, “আজ তোমাদের সাথে গল্প করব।”
গল্পটা সাড়ে চার বছর আগের। লন্ডনের এক শান্ত বিকেল। সাথে ছিলেন স্ত্রী জোবাইদা রহমান। সেখানে গিয়েছিলেন তৎকালীন ক্রীড়া অনুরাগী, জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক। এক রেস্টুরেন্টে খাবার টেবিলে শুরু হলো আলাপ। আমিনুল আপাদমস্তক স্পোর্টসের মানুষ। আলাপ গড়াল দেশের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে। সেখানেই জন্ম নিল এক অমর আইডিয়া— ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’।
ডায়াসে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী বললেন, “আজকের অনুষ্ঠানের চিফ গেস্ট কারা জানো? এই গ্যালারিতে বসা ছোট বন্ধুরা, তোমরাই আজকের প্রধান অতিথি।”
গ্যালারিজুড়ে তখন করতালির ঢেউ। মুগ্ধতার সাতকাহন! উচ্ছ্বাসের আবাহন।
আরও পড়ুন: নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস: প্রতিভা অন্বেষণে সরকারের মেগা প্রজেক্ট
স্বপ্ন যখন আকাশছোঁয়া
পড়াশোনার সাথে খেলাধুলার এক অটুট বন্ধন। এটাই প্রধানমন্ত্রীর চাওয়া। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, “পড়ালেখা মাফ করা যাবে না। তবে পড়ার পাশাপাশি খেলতে হবে।”
লক্ষ্যটা স্থির করতে হবে এখন থেকেই। কেউ হবে ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার। কেউবা হবে মাঠ কাঁপানো ফুটবলার। প্রধানমন্ত্রী এক অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন খুদেদের সাথে— “তোমরা নিজেদের তৈরি করো, সরকার আছে তোমাদের পাশে।”
এই শিশুদের চোখে তিনি দেখলেন আগামীর বাংলাদেশ। কেউ হবে বিশ্বখ্যাত মিউজিশিয়ান, কেউবা হবে দেশের অ্যাম্বাসেডর।

সিলেট থেকে সারা বাংলা
উদ্বোধনের জন্য বেছে নেওয়া হলো সিলেটকে। ঢাকার বাইরে থেকে যাত্রা শুরুর এই নির্দেশ ছিল খোদ প্রধানমন্ত্রীর। তাঁর ভাষায়, “সবসময় কেন ঢাকা? এবার ঢাকার বাইরে হোক।”
এই আয়োজন কেবল সিলেটের নয়। ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিল সারা দেশ। ১০টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে মানচিত্রকে। ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের এই মহাযজ্ঞ। ১ লাখ ৬৭ হাজারেরও বেশি খুদে অ্যাথলেট নাম লিখিয়েছেন এই যুদ্ধে। ঢাকা থেকে ছুটে এসেছেন ৩২ জন দেশসেরা তারকা। তাঁরা এই নতুন স্বপ্নের ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’।
মাঠের লড়াই ও আগামীর প্রতিশ্রুতি
ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গড়ার অঙ্গীকার। সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছে সরকার। চালু হয়েছে ক্রীড়া কার্ড ও বিশেষ ভাতা। ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি থেকে দাবা—৮টি জনপ্রিয় ইভেন্টে চলবে লড়াই। ১৩ মে থেকে শুরু হচ্ছে আঞ্চলিক পর্বের রোমাঞ্চ।
সিলেটের আকাশ আজ মেঘলা ছিল। কিন্তু স্টেডিয়ামের ভেতর জ্বলছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার প্রদীপ। লিস্টার সিটির রূপকথার মতো কোনো অসম্ভব বাজি নয়, এ এক নিশ্চিত আগামীর গল্প। মাঠের ঘাস আর খুদেদের ঘাম মিলেমিশে তৈরি হচ্ছে এক নতুন ইতিহাস।
গল্প শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “তোমাদের সবাইকে বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর হতে হবে। হবে তো?” সমস্বরে উত্তর এলো— “ইয়েস!” সেই গগনবিদারী চিৎকারে যেন লেখা হলো এক নতুন বাংলাদেশের ইশতেহার।

