আইপিএল ২০২৬ সিজনে ব্যাটিংয়ের সংজ্ঞাই যেন বদলে গেছে। চলতি আসরের প্রথম ৪৮ ম্যাচ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০ বা তার বেশি রান তোলা এখন কোনো বিশেষ কৃতিত্ব নয়, বরং একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই বিশাল রানগুলো তাড়া করার ক্ষেত্রে দলগুলোর অবিশ্বাস্য পারদর্শিতা। গত আসরেও রানের জোয়ার দেখা গিয়েছিল, কিন্তু ২০২৬ সিজন আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
২০০+ রান তাড়া: এখন আর ‘অসাধ্য’ নয়
আইপিএল ২০২৬-এর প্রথম ৪৮ ম্যাচে দলগুলো মোট ৩৯ বার ২০০-এর বেশি স্কোর গড়েছে। গত সিজনের একই পর্যায় পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল মাত্র ২৭। তবে বড় চমক হলো রান তাড়া করার সাফল্যের হার।
চলতি আসরে ২০০ বা তার বেশি রান তাড়া করতে নেমে দলগুলোর জয়ের রেকর্ড ১২-১১ (১২ জয়, ১১ হার)। গত বছর এই সময়ে রেকর্ডটি ছিল মাত্র ৪-১৩। এমনকি ২২০-এর বেশি রানের লক্ষ্যও এখন নিয়মিত তাড়া করা হচ্ছে।
এই মৌসুমে ২২০+ লক্ষ্য তাড়া করে ১৩টি ম্যাচের মধ্যে ৮টিতেই জিতেছে পরে ব্যাটিং করা দল। গত বছর ১৫টি এমন ম্যাচে মাত্র ২টিতে জিতেছিল তাড়া করা দলগুলো। ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার রুল থাকলেও ব্যাটিংয়ের এই আমূল পরিবর্তন ক্রিকেট বিশ্বকে রীতিমতো স্তম্ভিত করে দিয়েছে।
আরও পড়ুন:
আইপিএল ফাইনাল নিয়ে আচমকা বড় সিদ্ধান্ত নিল বিসিসিআই
পাওয়ার প্লে-র তাণ্ডব
রান তাড়া করার ক্ষেত্রে সাফল্যের মূল ভিত্তি রচিত হচ্ছে প্রথম ৬ ওভারে। এই মৌসুমে পাওয়ার প্লে-তে গড় রান রেট রেকর্ড ১০-এ পৌঁছেছে। তবে ২০০+ রান তাড়া করার ম্যাচগুলোতে এই হার আরও ভয়ংকর।
গড় রান রেট: ২৩টি ২০০+ রান তাড়া করার ম্যাচে পাওয়ার প্লে-তে গড় রান রেট ছিল ১১.৭৮।
সাফল্যের হার: ১২টি সফল রান তাড়ার ম্যাচে পাওয়ার প্লে-তে রান রেট ছিল ১৩.৮১, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২১% বেশি।
অবদান: এই ১২টি সফল ম্যাচে দলগুলো পাওয়ার প্লে-তেই লক্ষ্যের প্রায় ৩৭% রান তুলে ফেলেছে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা গেছে গুয়াহাটিতে রাজস্থান রয়্যালস বনাম আরসিবি ম্যাচে। ২০২ রান তাড়া করতে নেমে বৈভব সূর্যবংশীর ২৬ বলে ৭৮ রানের ঝড়ে পাওয়ার প্লে-তেই ৯৭ রান তুলে ফেলে রাজস্থান। এছাড়া পাঞ্জাব কিংসের দিল্লির বিপক্ষে ২৬৫ রান তাড়া করার ম্যাচেও পাওয়ার প্লে-র বিধ্বংসী রূপ দেখা গিয়েছিল।
হাফওয়ে মার্ক বা ১০ ওভারের নিয়ন্ত্রণ
১০ ওভার শেষে সফল রান তাড়ার ১২টি ম্যাচের মধ্যে ১০টিতেই দলগুলো লক্ষ্যের অন্তত ৫০% রান তুলে নিয়েছে। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হাতে ছিল ৮ থেকে ৯টি উইকেট। রাজস্থান রয়্যালস আরসিবির বিপক্ষে ১০ ওভারেই লক্ষ্যের ৬৮% রান শেষ করে দিয়েছিল। এমনকি আরসিবি বনাম গুজরাট টাইটানস ম্যাচে শুরুতে ধীরগতি থাকলেও ১০ ওভার শেষে আরসিবির স্কোর ছিল লক্ষ্যের ৫৭%।
এই নিয়ন্ত্রণের ফলে ১১টি ম্যাচে শেষ ১০ ওভারে প্রয়োজনীয় রান রেট ১১-এর নিচে নেমে আসে, যা আধুনিক টি-টোয়েন্টিতে অত্যন্ত সহজসাধ্য। পরিসংখ্যান বলছে, এই ১২টি সফল রান তাড়ার মধ্যে মাত্র ৩টি ম্যাচ ২০তম ওভার পর্যন্ত গড়িয়েছে, বাকিগুলো ১৯ ওভারের মধ্যেই শেষ হয়েছে। আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে আরসিবি ১৯.২ ওভার নয়, বরং মাত্র ১৫.৪ ওভারে ২০২ রান তাড়া করে আইপিএলের দ্রুততম ২০০+ রান তাড়া করার রেকর্ড গড়ে সিজনের সুর বেঁধে দেয়।
ব্যর্থতা ও নতুন মানদণ্ড
অবশ্য সব বড় রান তাড়া সফল হয়নি। ১১টি ম্যাচে রান তাড়া করতে গিয়ে দলগুলো বড় ব্যবধানে হেরেছে। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স ও সিএসকের মতো দলগুলো বড় ব্যবধানে প্রতিপক্ষকে হারিয়েছে, যেখানে হারের গড় ব্যবধান ছিল ৪৭ রান।
তবে সামগ্রিকভাবে আইপিএল ২০২৬ এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। গত ১৭ বছরের আইপিএল ইতিহাসে ২২০-এর বেশি লক্ষ্য তাড়া করার ঘটনা ছিল মাত্র ৫টি। আর এই এক আসরেই মাত্র ৪৮ ম্যাচের মধ্যে সেই রেকর্ড ভেঙে ৮ বার ২২০+ রান তাড়া করা হয়েছে।
ব্যাটিংয়ের এই নতুন মানদণ্ড বুঝিয়ে দিচ্ছে, বোলারদের জন্য বর্তমান টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট কতটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন:
২০০৮ আইপিএলে কুখ্যাত ‘স্ল্যাপগেট’: বিতর্ক বাড়ালেন হরভজন, ক্ষুব্ধ শ্রীশান্ত

