১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ। বোর্দোর মাঠে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে একসঙ্গে লড়ছিলেন আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার পাবলো পাস এবং অক্লান্ত মিডফিল্ডার ডিয়েগো সিমিওনে। তেনেরিফে ও ইন্টার মিলানের সেই দুই লড়াকু ফুটবলার সেদিন ভাবতেও পারেননি, ঠিক ২৮ বছর পর তাঁদের সেই রাতের গল্পটা এক রূপকথার জন্ম দেবে। ২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণার পর আর্জেন্টিনার ৯৬ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে যুক্ত হলো সম্পূর্ণ অলৌকিক এক অধ্যায়। এই প্রথম একই বিশ্বকাপে খেলছেন সাবেক দুই সতীর্থের দুই সন্তান—নিকো পাস ও গিলিয়ানো সিমিওনে।
আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে বাবা ও ছেলের জাতীয় দলে খেলার নজির থাকলেও, একই টুর্নামেন্টে খেলা সাবেক দুই সতীর্থের দুই সন্তান একসঙ্গে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা পাওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম। শুধু তা-ই নয়, আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে এবারই প্রথম একই সাথে দুজন বিদেশ-বিভুঁইয়ে জন্ম নেওয়া ফুটবলার বিশ্বমঞ্চে আলবিসেলেস্তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন। এর আগে ১৯৩০ সালে পেদ্রো সুয়ারেজ, ১৯৩৪ সালে কনস্ট্যান্টিনো উরদিয়েটা এবং ২০১০ থেকে ২০১৮ বিশ্বকাপে খেলা গঞ্জালো হিগুয়েন ছাড়া আর কোনো বিদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলার আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিশ্বকাপ খেলেননি।
ইউরোপের মাটি থেকে আর্জেন্টিনার রক্ত
নিকো পাসের জন্ম স্পেনের সান্তা ক্রুজ দে তেনেরিফেতে, যখন তাঁর বাবা পাবলো পাস সেখানে ক্লাব ফুটবল খেলছিলেন। বাহিয়া ব্লাঙ্কা থেকে উঠে আসা পাবলো নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ ও ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তে খেলে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
তাঁর ছেলে নিকো রিয়াল মাদ্রিদের একাডেমি ঘুরে এখন ইতালির ক্লাব কোমোর মাঝমাঠ শাসন করছেন।
অন্যদিকে, গিলিয়ানো সিমিওনের জন্ম ইতালির রোমে, যখন তাঁর বাবা ডিয়েগো সিমিওনে লাৎসিওর হয়ে সিরি আ মাতাচ্ছিলেন। বাবা ডিয়েগো পরে স্প্যানিশ ক্লাব আতলেতিকো মাদ্রিদের কিংবদন্তি কোচ হয়েছেন, আর ছেলে গিলিয়ানো এখন সেই একই ক্লাবের দুর্দান্ত উইঙ্গার।
বাবার মতোই তীক্ষ্ণ ও লড়াকু মানসিকতা নিয়ে তিনি কোচের মন জয় করেছেন।
১৯৯৮-এর সেই ট্র্যাজেডি ও ২০২৬-এর বৃত্ত পূরণ
পাবলো পাসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ১৯৯৮ সালের সেই বিশ্বকাপের পরেই মাত্র ১৪ ম্যাচে থমকে গিয়েছিল।
তবে ডিয়েগো সিমিওনে খেলেছেন তিনটি বিশ্বকাপ এবং আর্জেন্টিনার ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ১০০ ম্যাচের মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের ২৫ মে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এক প্রস্তুতি ম্যাচে পাবলো পাসের সঙ্গে রক্ষণভাগে খেলেছিলেন রবার্তো আয়ালা, যিনি এখন বর্তমান কোচ লিওনেল স্কালোনির প্রধান সহকারী। অর্থাৎ, বাবার সাবেক সতীর্থের হাতেই এখন গড়ে উঠছে ছেলেদের এই নতুন প্রজন্ম।
২০১৭ সাল থেকে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (AFA) ইউরোপে ছড়িয়ে থাকা আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত প্রতিভাদের খুঁজে বের করতে একটি বিশেষ স্কাউটিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। যুব দলের সমন্বয়কারী এনরিকে সেসানা এই প্রজেক্ট নিয়ে বলেন, “এই ছেলেরা স্প্যানিশ বা ইতালিয়ান টানে কথা বলতে বলতে ক্যাম্পে আসে, কিন্তু চলে যাওয়ার সময় খাঁটি আর্জেন্টাইন হয়ে যায়।”
তিনি মনে করিয়ে দেন, শৈশবে বার্সেলোনায় চলে যাওয়া লিওনেল মেসিকে যদি সময়মতো ধরে রাখা না যেত, তবে হয়তো তাঁকে স্পেনের জার্সিতেই দেখতে হতো।
আগামী ১৬ জুন কানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বজয়ের মুকুট ধরে রাখার মিশন শুরু করবে আর্জেন্টিনা, যেখানে ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় দুই বন্ধুর দুই ছেলে।
আরও পড়ুন:
মেসির শেষ মঞ্চে ৬৪ বছরের প্রাচীর ভাঙতে পারবে আর্জেন্টিনা?

