The trophy of the FIFA World Cup.

ফুটবল কি কেবলই ৯০ মিনিটের চিলতে সবুজ ঘাসে একটা চামড়ার গোলকের পেছনে ২২ জন মানুষের উন্মাতাল দৌড়? নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু? কোনো এক বিষণ্ন বিকেলে, যখন স্টেডিয়ামের গ্যালারি ফেটে পড়ে লাখো মানুষের গগনবিদারী চিৎকারে, তখন আসলে রচিত হয় এক একটি ট্র্যাজেডি কিংবা মহাকাব্য। ফুটবলবিশ্বের সবচেয়ে বড় এই মঞ্চে কেউ আসে ট্রফি ছুঁয়ে অমরত্বের খোঁজে, কেউ আসে ফাইনালের ট্র্যাজেডিতে পুড়ে খাক হতে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় সেইসব দলগুলোর জন্য এক আলাদা সিংহাসন পাতা থাকে, যারা মাঠের লড়াইকে স্রেফ জয়-পরাজয়ের বৃত্তে বন্দি রাখেনি; বরং গোল করাটাকে বানিয়ে ফেলেছে এক একটি চিরন্তন শিল্পকর্মে।

লড়াইটা যখন ফিফা বিশ্বকাপের, তখন গোল মানে কেবলই স্কোরবোর্ডের একটি সংখ্যার পরিবর্তন নয়। গোল মানে জাল কাঁপিয়ে কোটি ভক্তের বুকে আনন্দের সুনামি বইয়ে দেওয়া, গোল মানে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে কচুকাটা করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের জানান দেওয়া। শত বছরের এই ফুটবল মহাযজ্ঞে আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে, ভয়ডরহীন ফুটবল খেলে বিশ্বকাপের জালকে সবচেয়ে বেশি যারা কাঁদিয়েছে, যারা গড়ে তুলেছে নিজেদের এক একটি ফুটবল সাম্রাজ্য—আজকের এই বিশেষ আয়োজন সেই শীর্ষ দশ গোল-সাম্রাজ্যের সুলতানদের নিয়ে।

মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র আর কানাডার মাটিতে ২০২৬ বিশ্বকাপের আলো ঝলমলে মঞ্চে বল মাঠে গড়ানোর ঠিক আগমুহূর্তে অতীতের রোমন্থন মন্দ হয় না আসলে।

ফিরে দেখা যাক, বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে বেশি গোল উৎসব করা ইতিহাসের শীর্ষ দশ পরাশক্তি কারা।

ধ্রুপদি অতীত ও গোল-বন্যার ট্র্যাজেডি

১০. হাঙ্গেরি—৮৭ গোল

আধুনিক ফুটবলপ্রেমীরা হয়তো আজকের দিনে হাঙ্গেরিকে ফুটবলের পরাশক্তি হিসেবে ভাবতেও দ্বিধা করবেন।

কিন্তু ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে দেখা যাবে, বিশ্বকাপের শুরুর দশকগুলোতে এই হাঙ্গেরিই ছিল এক একটি নির্মম ‘গোল মেশিন’। ১৯৫০-এর দশকে পুসকাস, স্যান্ডর কোকসিসদের নিয়ে গড়া ‘ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স’ ছিল বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। তাঁরা বিশ্বকাপ ট্রফি হয়তো ছুঁয়ে দেখতে পারেননি, কিন্তু বিশ্বকাপে খেলা দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য এবং সর্বোচ্চ গড় গোলের মালিক কিন্তু হাঙ্গেরিই!

ম্যাচ প্রতি ২.৭২ গোলের সেই দানবীয় রেকর্ড আধুনিক ফুটবলের যুগেও অক্ষত, যা ভাঙা হয়তো কোনোদিনও সম্ভব নয়। বিশ্বকাপের আসরে সবমিলিয়ে ৮৭ গোল নিয়ে হাঙ্গেরি আছে শীর্ষ দশের ঠিক দশ নম্বরে।

৯. উরুগুয়ে—৮৯ গোল

বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্মলগ্নের সাথে যে দেশটির নাম নাড়ির টানে যুক্ত, সেটি উরুগুয়ে।

১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেছিল এই ‘লা সেলেস্তে’রাই। মানচিত্রে ছোট একটি দেশ হতে পারে, কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে তারা এক এক পরাক্রমশালী দানব। সেই জোসে নাসাজ্জি থেকে শুরু করে ডিয়েগো ফোরলান, লুইস সুয়ারেজ, এডিনসন কাভানি কিংবা অস্কার মিগুয়েজদের হাত ধরে উরুগুয়ে তাদের আক্রমণাত্মক ফুটবলের ঐতিহ্যকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকিয়ে রেখেছে, যার প্রমাণ বিশ্বকাপের মঞ্চে ৮৯টি দুর্দান্ত গোল।

৮. নেদারল্যান্ডস—৯৬ গোল

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর অথচ ট্র্যাজিক রোমান্টিক দলটির নাম নেদারল্যান্ডস।

সত্তরের দশকে রাইনাস মিশেলস আর ইয়োহান ক্রুইফের হাত ধরে যে ‘টোটাল ফুটবল’ বিপ্লবের জন্ম হয়েছিল, তা বিশ্বকাপের খোলনলচেই বদলে দিয়েছিল। ট্রফি না জিতেও কীভাবে ফুটবল বিশ্বের মন জয় করা যায় এবং প্রতিপক্ষকে গোলের বন্যায় ভাসানো যায়, তা ডাচদের চেয়ে ভালো আর কে জানে! ইয়োহান ক্রুইফ থেকে শুরু করে ডেনিস বার্গক্যাম্প, আরিয়েন রুবেন কিংবা রবিন ফন পার্সির সেই জাদুকরী ডাইভিং হেডের গল্প—সবমিলিয়ে ৯৬ গোল নিয়ে ডাচরা ফুটবলের অন্যতম নান্দনিক গোলদাতা।

আরও পড়ুন:
বিশ্বকাপ ফুটবলের অবিশ্বাস্য ১০ মহাঅঘটন

শতকের সীমানা পেরিয়ে ফুটবলের আভিজাত্য

৭. ইংল্যান্ড—১০৪ গোল

আধুনিক ফুটবলের অন্যতম ধারাবাহিক ও জমকালো হাইপ তোলা দল ইংল্যান্ড।

১৯৬৬ সালের বিশ্বজয়ী ববি চার্লটনদের যুগ থেকে শুরু করে গ্যারি লিনেকার, অ্যালান শিয়ারার হয়ে আজকের দিনের হ্যারি কেইন কিংবা জুড বেলিংহাম—ইংল্যান্ড প্রতিনিয়ত এমন সব স্ট্রাইকার উপহার দিয়েছে, যারা গোল করাটাকে ডালভাত বানিয়ে ফেলেছেন। ধারাবাহিক আক্রমণের এই ধারা বজায় রেখেই থ্রি লায়ন্সরা ইতোমধ্যে বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোলের সেঞ্চুরি পার করে ১০৪টি গোল নিজেদের ঝুলিতে পুরেছে।

৬. স্পেন—১০৮ গোল

স্প্যানিশ ফুটবল বছরের পর বছর ধরে ‘চোকার্স’ অপবাদ সয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের শক্তি প্রমাণ করার জন্য লড়াই করেছে।

কিন্তু যখনই তারা নিজেদের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে, বিশ্ব ফুটবলকে উপহার দিয়েছে এক নতুন দর্শন—টিকিটাকা। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাভি হার্নান্দেজ, ডেভিড ভিয়া আর ফার্নান্দো তোরেসদের নিয়ে গড়া সেই সোনালী প্রজন্ম ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথম বিশ্বজয়ের স্বাদ এনে দেয়। স্পেনের সেই শৈল্পিক পাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ধারালো আক্রমণই তাদেরকে ১০৮ গোল নিয়ে বিশ্বমঞ্চের এলিট ক্লাবের ৬ষ্ঠ স্থানে বসিয়েছে।

৫. ইতালি—১২৮ গোল

বিশ্বকাপের নাড়ি নক্ষত্র ইতালির চেয়ে ভালো খুব কম দলই বোঝে। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ‘আজ্জুরি’রা রক্ষণাত্মক ফুটবলের জন্য কুখ্যাত হতে পারে, কিন্তু গোল করার ক্ষেত্রে তারা কম যায়নি কোনো অংশে। পাওলো রসি কিংবা রবার্তো ব্যাজ্জির মতো ফুটবল ঈশ্বরদের পায়ের জাদু, কিংবা ক্রিশ্চিয়ান ভিয়েরির মতো পাওয়ার ফুটবলের মিশেলে ইতালি গড়ে তুলেছে ১২৮ গোলের এক বিশাল পাহাড়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তারা বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নেই, পারফরম্যান্স বিবর্ণ, তবুও তাদের এই ইতিহাসকে মুছে ফেলার সাধ্য কারও নেই।

শীর্ষ চারের রাজকীয় লড়াই

৪. ফ্রান্স—১৩৬ গোল

গত তিন দশকে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় পাওয়ারহাউজ বা ট্যালেন্ট ফ্যাক্টরির নাম ফ্রান্স।

আশির দশকে মিশেল প্লাতিনির সেই রোমান্টিক যুগ থেকে ফরাসিরা আজ পরিণত হয়েছে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে। ১৯৯৮ সালে জিনেদিন জিদান আর থিয়েরি অঁরির হাত ধরে প্রথম বিশ্বজয়, আর ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং আঁতোয়ান গ্রিজম্যানদের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স ফ্রান্সকে গোলের তালিকায় রকেটের গতিতে ৪ নম্বরে নিয়ে এসেছে। ১৩৬ গোল করা ফরাসিদের বর্তমান যে স্কোয়াড, তাতে আগামী দিনে এই সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে থামবে, তা ভাবলে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের রাতের ঘুম হারাম হয়তো হারামই হবে!

৩. আর্জেন্টিনা—১৫২ গোল

ফুটবল যদি ধর্ম হয়, তবে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ হলো সেই ধর্মের প্রধান পুরোহিতদের চারণভূমি।

ডিয়েগো ম্যারাডোনা থেকে লিওনেল মেসি—আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাস মানেই একক জাদুকরদের অতিপ্রাকৃতিক সব গোল। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ থেকে শুরু করে ২০২২ সালে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে লিওনেল মেসির হাত ধরে সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মহাকাব্য—সবখানেই জড়িয়ে আছে গোলের তীব্র উন্মাদনা।

কাতার বিশ্বকাপের অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স আর্জেন্টিনাকে ১৫২ গোল নিয়ে এই তালিকার ৩ নম্বরে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে দেশের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুটটি নিজের মাথায় পরে নিয়েছেন খোদ লিওনেল মেসি।

২. জার্মানি—২৩২ গোল

বিশ্বকাপে জার্মানি মানেই এক যান্ত্রিক নিখুঁত ধারাবাহিকতা। জেনারেশনের পর জেনারেশন পার হয়ে গেলেও জার্মানদের পারফরম্যান্সে মরচে পড়ে না কখনো। বিশ্বকাপে জার্মানির গোলসংখ্যা ২৩২!

এই বিশাল সংখ্যার পেছনে রয়েছে একদল গোলশিকারী নেকড়ে। জার্ড ম্যুলার, থমাস ম্যুলার আর সবার ওপরে ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা মিরোস্লাভ ক্লোসা (১৬ গোল)। ক্লোসার সেই বিখ্যাত সামারসল্ট সেলিব্রেশন আর জার্মানদের নিখুঁত কাউন্টার অ্যাটাক আজ তাদের ব্রাজিলের ঠিক ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ করে দিয়েছে।

ফুটবল ঈশ্বরের সিংহাসন!

১. ব্রাজিল—২৩৭ গোল

তালিকায় সবার ওপরে যে নামটি বসার কথা, ঠিক সেই নামটিই বসে আছে রাজকীয় সিংহাসনে—ব্রাজিল! পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ‘সেলেসাও’রা ফুটবলকে স্রেফ একটা খেলা থেকে রূপান্তর করেছে এক পরম উপাসনায়, এক জাদুকরী শিল্পে, যার নাম ‘জোগা বোনিতো’।

পেলে থেকে রোনালদো নাজারিও, রোমারিও, রিভালদো, রোনালদিনহো হয়ে নেইমার কিংবা আজকের দিনের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র—ব্রাজিল মানেই এক একটা মহাকাব্যিক গোল উৎসবের নাম। ২০০২ বিশ্বকাপে রোনালদোর সেই ফেয়ারওয়েল হেয়ারস্টাইল আর একের পর এক গোল, কিংবা ১৯৫৮ সালে ১৭ বছরের এক কিশোর পেলের বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে দেওয়া গোল—সব মিলিয়ে ২৩৭ গোল নিয়ে ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুটটি ব্রাজিলের মাথাতেই শোভা পাচ্ছে।

সিলভা-ভিনিসিয়ুসরা যখনই হলুদ জার্সি গায়ে মাঠে নামেন, সাম্বার তালে প্রতিপক্ষের জাল কাঁপানো যেন তাদের কাছে এক পবিত্র দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।

ইতিহাস নতুন করে লেখার মহালগ্ন

ইতিহাসের এই সোনালী পরিসংখ্যানগুলো মেক্সিকোর আসতেকা স্টেডিয়াম কিংবা নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে গিয়ে এক নতুন বাঁক নিতে যাচ্ছে। কারণ, ২০২৬ বিশ্বকাপ আর কোনো সাধারণ বিশ্বকাপ নয়। এবারই প্রথম ৪৮টি দেশ নামছে বিশ্বজয়ের লড়াইয়ে, ম্যাচের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে হচ্ছে ১০৪টি!

ম্যাচ এবং দল বাড়ার এই মহাযজ্ঞে সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চটা লুকিয়ে আছে একদম শীর্ষ দুই আসনের লড়াইয়ে। ব্রাজিল (২৩৭) এবং জার্মানির (২৩২) মধ্যে গোলের ব্যবধান মাত্র ৫টি! উত্তর আমেরিকার মাটিতে জার্মান মেশিনের গোলবন্যা কি ব্রাজিলকে হটিয়ে দিতে পারবে সিংহাসন থেকে? নাকি নেইমার-ভিনিসিয়ুস সাম্বা নৃত্যে ব্যবধানটা আরও বাড়িয়ে নেবে সেলেসাওরা? অন্যদিকে এমবাপ্পের ফ্রান্স কিংবা মেসির আর্জেন্টিনা কি পারবে শীর্ষ দুইয়ের সাথে ব্যবধানটা কমিয়ে আনতে?

উত্তর দেবে সময়। তবে ১ জুনের এই শান্ত সকালে দাঁড়িয়ে এটুকু হলফ করে বলাই যায়—আমেরিকার মাঠে যখন বল গড়াবে, তখন পুরোনো সব পরিসংখ্যান স্রেফ কাগজের টুকরো হয়ে বাতাসে উড়বে। আমরা কেবল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে পারি আরও কিছু জালের ক্রন্দনের, আরও কিছু নতুন ফুটবল ঈশ্বরের জন্মের আর কোটি মানুষের বুটের ডগায় রচিত হতে যাওয়া এক নতুন গোল-মহাকাব্যের!

আরও পড়ুন:
৬ গোল দিয়ে ব্রাজিলের বার্তা, রণকৌশল নিয়ে আনচেলত্তির রহস্য-রোমাঞ্চ